![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
হরমুজ প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক কনটেইনার জাহাজে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে তীব্র সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, হামলার জবাবে তারা ইরানের প্রায় ১৪০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে, ইরান জানিয়েছে, তারা জর্ডান, কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে তেহরান।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুনর্মূল্যায়ন না হওয়া পর্যন্ত এ নৌপথ বন্ধ থাকবে। আইআরজিসি দাবি করেছে, সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক জাহাজটি তাদের একাধিক সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে নির্ধারিত পথ পরিবর্তন করেছিল এবং নিজের অবস্থান শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ রেখেছিল। পরে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে প্রথমে গুলি এবং পরে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে জাহাজটিকে থামানো হয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) অভিযোগ করেছে, সাইপ্রাসের পতাকাবাহী ‘এমভি জিএফএস গ্যালাক্সি’ নামের কনটেইনার জাহাজে ইরানের হামলার ফলে জাহাজটির ইঞ্জিনকক্ষে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে জাহাজের নাবিকরা লাইফবোটে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন এবং একজন বেসামরিক নাবিক এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
সেন্টকম জানিয়েছে, এই ঘটনার জবাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, ড্রোন স্থাপনা, নৌ সক্ষমতা, গোলাবারুদের গুদাম, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থাসহ প্রায় ১৪০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, গত তিন দিনের অভিযানে মোট ৩০০টিরও বেশি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এদিকে ইরানও পাল্টা সামরিক অভিযান চালানোর দাবি করেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান ও কাতারে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে।
আইআরজিসির দাবি, জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটির একটি কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার এবং এমকিউ-৯ ড্রোন সংরক্ষণাগার ধ্বংস করা হয়েছে। এছাড়া কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটির একটি রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে বলে তারা জানিয়েছে।
তবে কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমার দিকে ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে এবং কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি।
এদিকে হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে প্রণালিটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের দামে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
সেন্টকম আরও জানিয়েছে, চলতি বছরের মে মাস থেকে তাদের সহায়তায় প্রায় ৮০০টি বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে, যেগুলোর মাধ্যমে প্রায় ৪০ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের এই পদক্ষেপের মাধ্যমে কার্যত সেই যুদ্ধবিরতির অবসান ঘটেছে। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি চুক্তি ভঙ্গের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকেই দায়ী করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।