![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ফুটবল কখনো শুধু ৯০ মিনিটের একটি খেলা নয়। কখনো এটি একটি দেশের ইতিহাস, একটি জাতির আবেগ, আবার কখনো কয়েক প্রজন্মের দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রতিচ্ছবি। দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরে নরওয়ে ঠিক তেমনই এক আবেগঘন অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে।
বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে ২-১ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হলেও, নরওয়ের এই যাত্রা ইতোমধ্যেই দেশটির ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে গেছে। কারণ, এই বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট ছিল না—এটি ছিল প্রায় তিন দশকের অপেক্ষার অবসান।
বিশ্বকাপের ম্যাচের দিন রাজধানী অসলো যেন অন্য এক শহরে পরিণত হয়েছিল। ব্যস্ত সড়ক হয়ে উঠেছিল অস্বাভাবিক শান্ত। রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, হাসপাতালের অপেক্ষাকক্ষ কিংবা অফিস—যেখানে টেলিভিশনের পর্দা ছিল, সেখানেই থমকে দাঁড়িয়েছিল মানুষ। সুযোগ পেলেই মোবাইল ফোনে স্কোর দেখছিলেন হাজারো সমর্থক। পুরো জাতি যেন একসঙ্গে শ্বাস নিচ্ছিল, একসঙ্গে স্বপ্ন দেখছিল।
১৯৯৮ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলতে নেমেছিল নরওয়ে। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেকেই প্রথমবার নিজেদের দেশকে বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখতে পেরেছে। আবার প্রবীণরা ফিরে গেছেন সেই স্মৃতিতে, যখন ব্রাজিলকে হারিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল নরওয়ে।
বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের আগে শহরের অলিগলি লাল-সাদা-নীল পতাকায় সাজানো ছিল। শিশুদের গায়ে জাতীয় দলের জার্সি, বড় পর্দার সামনে ভিড় আর প্রতিটি আড্ডায় একটাই নাম—আর্লিং হলান্ড।
ম্যানচেস্টার সিটির এই তারকা স্ট্রাইকার শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি হয়ে উঠেছিলেন পুরো দেশের আশার প্রতীক। প্রতিবার তিনি বল পেলে লাখো মানুষ নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করতেন। প্রতিটি আক্রমণ, প্রতিটি শট আর প্রতিটি গোলের সম্ভাবনার সঙ্গে ছুটে চলত একটি দেশের স্বপ্ন।
কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে নরওয়ে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল, এবারের গল্প আরও অনেক দূর যেতে পারে। কিন্তু ফুটবল কখনো কখনো সবচেয়ে নির্মম গল্পও লিখে দেয়। একটি ভুল, একটি মুহূর্ত কিংবা একটি গোল—সবকিছু বদলে দিতে পারে কয়েক সেকেন্ডেই।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ বাঁশি বাজতেই স্কোরবোর্ডে ভেসে ওঠে ২-১ ব্যবধান। সেখানেই শেষ হয় নরওয়ের বিশ্বকাপ অভিযান।
হারের পর অনেক সমর্থক নিঃশব্দে টেলিভিশন বন্ধ করেছেন। কোথাও কোনো শিশু চোখের জল লুকাতে পারেনি, আবার কোনো প্রবীণ দর্শক দীর্ঘ সময় নীরবে বসে থেকেছেন। তবে হতাশার মাঝেও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—নরওয়ের ফুটবল আবার জেগে উঠেছে।
এই বিশ্বকাপ দেশটিকে শুধু কয়েকটি জয় দেয়নি; ফিরিয়ে দিয়েছে আত্মবিশ্বাস, গড়ে দিয়েছে নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন এবং প্রমাণ করেছে, নরওয়ে আবারও আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় শক্তি হওয়ার পথে হাঁটছে।
হয়তো কয়েক বছর পর কোনো বাবা তার সন্তানকে বলবেন—”২০২৬ সালে আমরা আবার বিশ্বকাপে ফিরেছিলাম। আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম, আমরা বিশ্বাস করেছিলাম।”
বিশ্বকাপ থেকে নরওয়ের বিদায় হয়েছে ঠিকই, কিন্তু শেষ হয়নি তাদের গল্প। বরং এই যাত্রাই হয়তো দেশটির ফুটবলের নতুন এক স্বর্ণযুগের সূচনা হয়ে থাকবে।