![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
আফ্রিকার শৃঙ্গ অঞ্চলের স্বঘোষিত সোমালিল্যান্ডকে ঘিরে নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। উপকূলীয় শহর বারবেরার বিমানবন্দরে ব্যাপক নির্মাণকাজ এবং সামরিক অবকাঠামো সম্প্রসারণের খবর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও নিরাপত্তা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ ব্যবহারের জন্য সেখানে একটি কৌশলগত সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলার কাজ চলছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ দিকে ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকেই বারবেরা বিমানবন্দরের উন্নয়ন কার্যক্রম আরও গতি পায়। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এডেন উপসাগর এবং বাব-এল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি অবস্থানের কারণে বারবেরা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব আফ্রিকার নিরাপত্তা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্যাটেলাইট ছবিতে মিলেছে নির্মাণকাজের ইঙ্গিত
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের হাতে আসা সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ছবিতে বিমানবন্দরের রানওয়ের দক্ষিণাংশে বড় পরিসরে খননকাজের চিত্র দেখা গেছে। কয়েক মাসের ব্যবধানে সেখানে একাধিক গভীর পরিখা খনন এবং পরে সেগুলো কনটেইনার দিয়ে পূরণ করে পুনরায় মাটিচাপা দেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
ইউরোপীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা, এসব স্থাপনা ভূগর্ভস্থ গোলাবারুদ সংরক্ষণাগার কিংবা জ্বালানি সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। যদিও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
আমিরাতের সক্রিয় ভূমিকার দাবি
নিরাপত্তা সূত্রগুলোর দাবি, বিমানবন্দরের সামরিক অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ বাস্তবায়নে সংযুক্ত আরব আমিরাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ২০১৭ সালে সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির পর থেকেই দেশটি বারবেরা বিমানবন্দরের উন্নয়ন ও সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিভিন্ন প্রকল্পে যুক্ত রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, বিমানবন্দরটি বর্তমানে এমনভাবে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে এটি একাধিক দেশের সামরিক বাহিনীর জন্য যৌথ অপারেশন পরিচালনার উপযোগী হয়ে ওঠে।
হুথি সংকট ও কৌশলগত গুরুত্ব
লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশদ্বারে অবস্থিত বারবেরা বিমানবন্দর ইয়েমেন উপকূলের খুব কাছাকাছি হওয়ায় এর কৌশলগত গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। ইয়েমেনে সক্রিয় হুথি বিদ্রোহীদের হামলার ঝুঁকি এবং বাব-এল-মান্দেব প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগের কারণে পশ্চিমা মিত্রদের নজর এখন এই অঞ্চলের দিকে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে ইয়েমেনে সম্ভাব্য সামরিক অভিযান কিংবা সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বারবেরা গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিতে পরিণত হতে পারে।
জিবুতির বিকল্প হিসেবে বারবেরা
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই আফ্রিকার জিবুতিতে অবস্থিত সামরিক ঘাঁটির বিকল্প খুঁজছে। কারণ জিবুতিতে চীনের সামরিক উপস্থিতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ওয়াশিংটনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে সোমালিল্যান্ডের বারবেরা বিমানবন্দর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের জন্যও এটি এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগর অঞ্চলে কৌশলগত উপস্থিতি জোরদারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
আনুষ্ঠানিক অস্বীকৃতি, তবে বাড়ছে সহযোগিতা
যদিও ইসরায়েল এবং সোমালিল্যান্ড উভয় পক্ষই কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়টি প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি, বিভিন্ন নিরাপত্তা সূত্রের দাবি, উভয় দেশের মধ্যে সামরিক ও গোয়েন্দা পর্যায়ে যোগাযোগ ও সহযোগিতা ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।
এদিকে বারবেরা বিমানবন্দরে সাধারণ মানুষের প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাও উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার করা হয়েছে। নিয়মিত বিদেশি সামরিক প্রতিনিধিদলের সফর এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ধারাবাহিকতা এই বিমানবন্দরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি বারবেরা বিমানবন্দর পূর্ণাঙ্গ যৌথ সামরিক ঘাঁটিতে রূপ নেয়, তাহলে তা শুধু সোমালিল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্বই বাড়াবে না; বরং লোহিত সাগর, এডেন উপসাগর এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতিতেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।