• হোম > বাংলাদেশ > বিএমইটির ক্লিয়ারেন্স নিয়েই মানবপাচার! কম্বোডিয়া, ব্রাজিল ও রাশিয়া রুটে ভয়াবহ চিত্র

বিএমইটির ক্লিয়ারেন্স নিয়েই মানবপাচার! কম্বোডিয়া, ব্রাজিল ও রাশিয়া রুটে ভয়াবহ চিত্র

  • শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ১৫:২৫
  • ৬৮

---

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

বিদেশে বৈধভাবে কর্মসংস্থানের আশায় সরকারি অনুমোদন নিয়ে দেশ ছাড়লেও হাজার হাজার বাংলাদেশি মানবপাচার, সাইবার প্রতারণা, জোরপূর্বক শ্রম এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য ও ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা দেশের সরকারি অভিবাসন ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ মাসে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) কম্বোডিয়ায় কর্মসংস্থানের জন্য ১৫ হাজার ৯২১ জন বাংলাদেশিকে অফিসিয়াল ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স দিয়েছে। তবে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য বলছে, এদের মধ্যে এক হাজারের বেশি বাংলাদেশি সাইবার প্রতারণা চক্রের নিয়ন্ত্রিত কম্পাউন্ডে আটকা পড়েছেন। সেখানে তাদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা হচ্ছে।

বিভিন্ন উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে জুন মাসে ৫৮৩ জন এবং ১ জুলাই আরও ১০৯ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরলেও এখনো বহু মানুষ এসব চক্রের কবলে রয়েছেন। এতে স্পষ্ট হয়েছে, সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী চক্র সরকারি অভিবাসন ব্যবস্থার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে বৈধ কাগজপত্র ব্যবহার করেই মানুষকে বিদেশে পাঠাচ্ছে।

কম্বোডিয়ায় চাকরির নামে সাইবার প্রতারণার ফাঁদ

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আইটি বা কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার বেশি অর্থ নেওয়া হয়। বিএমইটির ক্লিয়ারেন্স নিয়ে বৈধভাবে কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর অনেককে প্রকৃত কর্মস্থলে না পাঠিয়ে অপরাধী চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

দেশে ফিরে আসা একাধিক কর্মী জানিয়েছেন, প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ অনলাইন প্রতারণা করতে বাধ্য করা হতো। লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো, এমনকি বৈদ্যুতিক শকও দেওয়া হতো।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শ্রী সনাতন জানান, বৈধ ওয়ার্ক ভিসা ও বিএমইটির ক্লিয়ারেন্স নিয়েই তিনি কম্বোডিয়ায় গিয়েছিলেন। চাকরির আশায় প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয় করলেও সেখানে গিয়ে চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েন।

ব্রাজিল হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ প্রবেশের প্রবণতা

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ব্রাজিলকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগও দিন দিন বাড়ছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরু থেকে ১ হাজার ৪১০ জন বাংলাদেশি বিএমইটির অনুমোদন নিয়ে ব্রাজিলে গেছেন। এর মধ্যে শুধু নোয়াখালী জেলা থেকেই গেছেন ৯৯০ জন।

যুক্তরাষ্ট্রে অনিয়মিত অভিবাসনের বিরুদ্ধে অভিযানে ইতোমধ্যে ৩২২ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাদের অনেকেই প্রথমে বৈধভাবে ব্রাজিলে গিয়ে পরে দালালচক্রের সহায়তায় বিভিন্ন দেশ পেরিয়ে মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন।

ফেরত আসা কয়েকজন জানান, এই যাত্রায় তাদের ৪৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে। অনেকেই দীর্ঘ সময় আটক থাকার পর দেশে ফিরেছেন।

রাশিয়ায় নির্মাণ শ্রমিক থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে

সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ এসেছে রাশিয়ায় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে। নির্মাণকাজের ভিসা নিয়ে যাওয়া কয়েকজন বাংলাদেশিকে পরে যুদ্ধসংশ্লিষ্ট কাজে এবং সামরিক কার্যক্রমে যুক্ত হতে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০ জন বাংলাদেশি এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে চারজন নিহত হয়েছেন এবং অন্তত ১৫ জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।

একজন আহত কর্মী অডিও বার্তায় জানান, তারা নির্মাণকাজের জন্য গেলেও পরে এমন নথিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন, যার ভাষাও তারা বুঝতেন না। এরপর তাদের যুদ্ধসংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও অধিকারকর্মীরা বলছেন, বারবার একই ধরনের ঘটনা ঘটায় বিএমইটির যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাদের মতে, রিক্রুটিং এজেন্সি, বিদেশি নিয়োগকর্তা এবং চাকরির প্রকৃত তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা না হলে এ ধরনের মানবপাচার ও প্রতারণা বন্ধ করা সম্ভব হবে না।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর শরিফুল হাসান বলেন, সাইবার প্রতারণা এখন মানবপাচারের নতুন ও অত্যন্ত জটিল রূপে পরিণত হয়েছে। তিনি মনে করেন, বিশেষ করে ব্রাজিলগামী কর্মীরা প্রকৃত চাকরির জন্য যাচ্ছেন নাকি দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের রুট হিসেবে ব্যবহার করছেন, তা আরও কঠোরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

কঠোর হচ্ছে সরকারি নীতিমালা

ক্রমবর্ধমান সংকটের প্রেক্ষাপটে সরকার উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত কম্বোডিয়া, লাওস ও ব্রাজিলের ক্ষেত্রে যাচাই প্রক্রিয়া আরও কঠোর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে এসব দেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে দূতাবাসের সত্যায়ন, বৈধ ওয়ার্ক ভিসা এবং পূর্ণাঙ্গ যাচাই-বাছাই বাধ্যতামূলক করা হবে। একই সঙ্গে মানবপাচারকারী চক্রের অপব্যবহার ঠেকাতে বিদ্যমান নীতিমালার ফাঁকফোকরও বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এদিকে বিএমইটির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও সংস্থাটি এ প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত কোনো উত্তর দেয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে নিরাপদ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে শুধু আইন কঠোর করাই যথেষ্ট নয়; বরং রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, কঠোর তদারকি এবং ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/13553 ,   Print Date & Time: Saturday, 17 October 2026, 09:19:39 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh