![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিতে বড় রূপান্তরের পথে বাংলাদেশ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আসছেন ২ কোটি ৭৫ লাখ কৃষক
দেশের কৃষিকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, লাভজনক ও টেকসই খাতে রূপান্তরের লক্ষ্যে একগুচ্ছ বাস্তবমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে সরকার। গবেষণা, উদ্ভাবন, যান্ত্রিকীকরণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ (এআই) আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে কৃষি ব্যবস্থাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৮ জুলাই) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব তথ্য জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার কৃষিকে সনাতনী ও শ্রমনির্ভর পদ্ধতি থেকে বের করে গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর, প্রতিযোগিতামূলক, লাভজনক এবং টেকসই খাতে রূপান্তরের লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
তিনি জানান, কৃষি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে কৃষক নিবন্ধন, জাতীয় কৃষক ডাটাবেজ, ডিজিটাল কৃষিসেবা, মোবাইলভিত্তিক আবহাওয়ার তথ্য, বাজারদর, কৃষি পরামর্শ, ই-সম্প্রসারণ সেবা এবং অনলাইন কৃষিসেবা প্ল্যাটফর্ম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষকের ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির পাশাপাশি সরকারি সেবা সরাসরি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কৃষক কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এই উদ্যোগের আওতায় সারাদেশের প্রায় ২ কোটি ৭৫ লাখ কৃষককে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং শ্রম সংকট মোকাবিলায় কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, সরকার আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণ করছে, যাতে কৃষি আরও লাভজনক ও দক্ষ হয়ে ওঠে।
কৃষিতে স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, রিমোট সেন্সিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), ড্রোন, জিপিএস, স্যাটেলাইট তথ্য এবং বিগ ডাটা প্রযুক্তি কৃষি ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করা হচ্ছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে ফসলের স্বাস্থ্য ও বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ, রোগবালাই দ্রুত শনাক্তকরণ, সুনির্দিষ্ট সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা এবং বৈজ্ঞানিক উৎপাদন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, তথ্যনির্ভর নিখুঁত কৃষি (Precision Agriculture) চালুর মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমবে, কৃষকের আয় বাড়বে এবং নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা সহজ হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, কৃষকদের জন্য চালু করা হয়েছে ‘খামারি অ্যাপ্লিকেশন’। এই অ্যাপের মাধ্যমে কোন এলাকায় কোন সময়ে কোন ফসল সবচেয়ে ভালো হবে, কতটুকু সার প্রয়োজন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং আধুনিক কৃষি পরামর্শ সহজেই পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি বলেন, রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জৈবসার ও পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কৃষিকে জলবায়ু-স্মার্ট ও অভিযোজনক্ষম খাতে রূপান্তরের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
এদিকে ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. শহিদুল ইসলামের এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, পেঁয়াজ ও রসুনের অপচয় কমানো, সংরক্ষণব্যবস্থা আধুনিক করা এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ পেঁয়াজ উৎপাদন এলাকায় পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রতিকূল প্রভাব প্রশমনে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে পেঁয়াজ সংরক্ষণ’ প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ৩ হাজার ৫০০টি এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া চলমান প্রকল্পের আওতায় ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলায় ৯০০টি আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি ঘরে ১০ থেকে ১২ টন পর্যন্ত পেঁয়াজ ও রসুন সংরক্ষণ করা সম্ভব।
প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় আরও ১৯ হাজার কৃষকের মধ্যে এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন একটি প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদন এলাকায় আরও ৮ হাজার এয়ার ফ্লো মেশিন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে পেঁয়াজ ও রসুনের অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে, সংরক্ষণ সুবিধা বাড়বে এবং কৃষকরা মৌসুম শেষে আরও ভালো দামে তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারবেন।
প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, সরকারের চলমান এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের কৃষি আরও প্রযুক্তিনির্ভর, উৎপাদনশীল, লাভজনক ও টেকসই খাতে পরিণত হবে এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।