![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
৪১২ মিলিমিটারের রেকর্ড বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের শঙ্কায় জনজীবন অচল
মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের রেকর্ডে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে নগরের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা, যান চলাচলে স্থবিরতা, শিক্ষা কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং পাহাড়ধসের আশঙ্কায় নগর ও আশপাশের এলাকায় চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা পর্যবেক্ষণাগারের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ। এরপর বুধবার সকাল পর্যন্ত আরও ২৩৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ফলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
ভারী বর্ষণে কাতালগঞ্জ, চকবাজার, আগ্রাবাদ, হালিশহর, কাপাসগোলা, পশ্চিম বাকলিয়া, অক্সিজেন-মদুনাঘাট সড়কসহ নগরের গুরুত্বপূর্ণ অনেক এলাকা পানিতে ডুবে যায়। অধিকাংশ সড়কে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় অফিসগামী মানুষকে দীর্ঘ সময় পানিতে দাঁড়িয়ে পরিবহনের অপেক্ষা করতে হয়েছে।
কাতালগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ও অফিসগামী আনোয়ার হোসেন জানান, প্রায় ২০ মিনিট অপেক্ষা করেও তিনি কোনো খালি রিকশা পাননি। বাধ্য হয়ে অনেকেই হেঁটে কিংবা পানির মধ্যে দিয়েই গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
টানা বর্ষণের কারণে নগরের ব্যবসা-বাণিজ্যেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। সোমবার রাত থেকেই বিভিন্ন দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিচতলায় পানি ঢুকে পড়ে। ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় অনেক ব্যবসায়ী দোকানপাট বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন।
শুধু নগরেই নয়, চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার অন্তত ১৬টি ইউনিয়নও বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। অনেক পরিবারের বসতঘর, উঠান এবং চলাচলের সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
অন্যদিকে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। আনোয়ারা উপজেলার অনেক এলাকায় ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে এইচএসসি পরীক্ষার্থীসহ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। পরীক্ষার্থী আকলিমা শারমিন বলেন, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড বুধবারের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করেছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় দিনের সব ক্লাস ও পরীক্ষা বাতিল করেছে। বিভিন্ন স্কুল-কলেজেও ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় জেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রাম, রাঙ্গুনিয়া, রাঙামাটির বাঘাইছড়ি এবং কক্সবাজারে দেয়াল ধস ও পাহাড়ধসের ঘটনায় গত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। উদ্ধার কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, শুক্রবার পর্যন্ত ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে জলাবদ্ধতা, পাহাড়ধস এবং আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রশাসন জনগণকে অপ্রয়োজনে বাইরে বের না হওয়ার, পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান না করার এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। আপাতত আকাশ পরিষ্কার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে পুরো চট্টগ্রাম।