![]()
একটি দেশের অর্থনীতির স্বাস্থ্য কেমন? এটি মাপার আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য নির্দেশক হলো ‘পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স’ বা পিএমআই সূচক। বাংলাদেশে এই প্রতিবেদনটি যৌথভাবে প্রকাশ করে এমসিসিআই ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ। এটি আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বোঝার প্রধান মানদণ্ড। গতকাল ২০২৬ সালের জুন মাসের পিএমআই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে স্বস্তি যেমন আছে, তেমনি আছে গভীর উদ্বেগও।
মে মাসে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় লাফ দেখা গিয়েছিল। কিন্তু জুন মাসে এসে সেই গতি এক ধাক্কায় বেশ কমে গেছে। মে মাসে সূচক ছিল ৬২ দশমিক ৮। জুনে তা ৯ দশমিক ৯ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ৯-এ। অর্থনীতির নিয়মে সূচক ৫০-এর ওপর থাকা মানেই হলো সম্প্রসারণ বা প্রবৃদ্ধি। সেই বিচারে বাংলাদেশ এখনো সংকোচনের বৃত্তে ঢোকেনি। অর্থাৎ, আমাদের অর্থনীতি এখনো বাড়ছে। কিন্তু চিন্তার বিষয় হলো বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া। এক মাসের ব্যবধানে এই পতন কেন হলো? এটি কি কেবল সাময়িক ধাক্কা, নাকি এর পেছনে গভীর কোনো কাঠামোগত সংকট রয়েছে? এটি এখন বড় প্রশ্ন।
গত মে মাসে পিএমআই সূচক এক লাফে অনেক উঁচুতে উঠেছিল। তখন অনেকের মনে আশার সঞ্চার হয়। মনে হয়েছিল, অর্থনীতি হয়তো দীর্ঘদিনের ক্লান্তি কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু জুনের পতন প্রমাণ করল আমাদের প্রবৃদ্ধি এখনো বেশ অস্থির। প্রায় ১০ পয়েন্টের এই পতনকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
প্রতিবেদনে এই ধীরগতির পেছনে তিনটি প্রধান কারণ দেখানো হয়েছে। সেগুলো হলো—দীর্ঘ ঈদের ছুটি, বর্ষার শুরু এবং ঈদ-পরবর্তী বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া। তাত্ত্বিকভাবে এই কারণগুলো খুবই যৌক্তিক। বাংলাদেশে যেকোনো বড় উৎসবের পর অর্থনৈতিক কার্যক্রমে এক ধরনের অলসতা আসে। কলকারখানা বন্ধ থাকে। শ্রমিকেরা ছুটিতে থাকেন। সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইন কিছুটা ব্যাহত হয়। কিন্তু প্রশ্ন অন্য জায়গায়। কেবল কি এই ঋতুভিত্তিক কারণেই সূচক এতটা নামল? নাকি এর আড়ালে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ডলার সংকটও নীরবে কাজ করেছে? নীতিনির্ধারকদের তা ভাবা দরকার।
সামগ্রিক সূচক কমলেও স্বস্তির জায়গা ধরে রেখেছে দেশের কৃষি ও সেবা খাত। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন মাসে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি কিছুটা মন্থর হয়েছে। তবে তা টানা দশম মাসের মতো সম্প্রসারণের ধারা বজায় রেখেছে। মে মাসের ৭০ থেকে নেমে জুনে এর সূচক দাঁড়িয়েছে ৬৪ দশমিক ৮-এ। নতুন ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কৃষি খাতের এই ধারাবাহিকতা ইতিবাচক। এটি আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির মজবুত ভিত্তির পরিচয় দেয়। তবে চিন্তার রেখা রয়েছে এর উপকরণ খরচে। সার, বীজ ও সেচের খরচ ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে কৃষকের প্রকৃত লাভ কমে যাচ্ছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে এই খাতের প্রবৃদ্ধিকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, সেবা খাত টানা ২১ মাসের মতো সম্প্রসারিত হয়েছে। যদিও মে মাসের ৬২ দশমিক ৩ থেকে কমে জুনে তা ৫৪ দশমিক ৬-এ নেমেছে। বাংলাদেশের জিডিপিতে সেবা খাতের অবদান অর্ধেকেরও বেশি। ব্যাংকিং, পরিবহন, তথ্যপ্রযুক্তি ও খুচরা ব্যবসার মতো খাতগুলো ধীরগতিতে হলেও সচল রয়েছে। এটি সামগ্রিক অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ স্থবির হওয়া থেকে রক্ষা করেছে। সেবা খাতের এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা জরুরি। এটি আমাদের কর্মসংস্থান ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা টিকিয়ে রাখছে।
জুনের পিএমআই প্রতিবেদনের সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিক হলো উৎপাদন ও নির্মাণ খাতের আকস্মিক সংকোচন। মে মাসে উৎপাদন খাতের সূচক ছিল ৬৪ দশমিক ১ পয়েন্ট। জুনে তা এক ধাক্কায় ১৫ দশমিক ৩ পয়েন্ট কমে ৪৮ দশমিক ৮-এ নেমে এসেছে। ৫০-এর নিচে নামার অর্থই হলো এই খাতটি এখন সংকোচনের মুখোমুখি। সহজ ভাষায়, এটি মন্দার আভাস। নতুন কার্যাদেশ বা অর্ডার কমে গেছে। রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে। বকেয়া কাজের আদেশ জমে গেছে। এসব কারণেই উৎপাদন খাতে এই বিপর্যয় ঘটেছে।
বাংলাদেশ একটি উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী দেশ। আমাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান চালিকাশক্তি হলো তৈরি পোশাক শিল্প। এই খাতে সংকোচন মানে হলো নতুন কর্মসংস্থান বন্ধ হওয়া। বিশ্ববাজারে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির কারণে আমাদের রপ্তানি আদেশ এমনিতেই চাপের মুখে রয়েছে। তার ওপর অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট ও ডলারের অভাব রয়েছে। এর ফলে কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। এসব সংকট উৎপাদন খাতের পতনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
একইভাবে বড় ধাক্কা খেয়েছে নির্মাণ খাত। মে মাসে ৫২ দশমিক ৯ পয়েন্ট নিয়ে এই খাত সাময়িক ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু জুনে এর সূচক এক লাফে ৪০ দশমিক ২-এ নেমে গেছে। নির্মাণ খাতের জন্য ৪০-এর ঘরের সূচক মানে তীব্র মন্দা। নতুন প্রকল্প গ্রহণ কমে গেছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতি এর অন্যতম কারণ। পাশাপাশি বেসরকারি আবাসন খাতেও স্থবিরতা চলছে। নির্মাণ খাতের সাথে রড, সিমেন্ট ও ইটের মতো শতাধিক শিল্প জড়িত। ফলে নির্মাণ খাতের এই স্থবিরতা দেশের সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে সরাসরি আঘাত করছে। উপকরণ খরচ অতিরিক্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা এখন নতুন প্রকল্পে হাত দিতে ভয় পাচ্ছেন।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। দেশের অর্থনীতি এখনো সামগ্রিকভাবে সম্প্রসারণের মধ্যে রয়েছে। তবে খাতভিত্তিক স্পষ্ট ভিন্নতা দেখা গেছে। এটি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় বার্তা। আমরা কেবল কৃষি ও সেবার ওপর ভর করে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারি না। এর জন্য আমাদের উৎপাদন ও নির্মাণ খাতকে শক্তিশালী অবস্থানে থাকতে হবে।
তবে আশার কথা হলো, প্রতিবেদনে ভবিষ্যৎ ব্যবসা সূচকের একটি পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আগামী দিনগুলোতে কৃষি, নির্মাণ ও সেবা খাতে সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকবে। উৎপাদন খাতটি আবার ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসবে। ব্যবসায়ীদের এই ইতিবাচক প্রত্যাশা অর্থনীতির মনোস্তাত্ত্বিক দিকের জন্য ভালো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেবল প্রত্যাশা দিয়ে কি বাজার চলবে? এর জন্য বাস্তবসম্মত নীতি সহায়তা বা পলিসি সাপোর্ট প্রয়োজন।
সংকট উত্তরণে করণীয় কী ?
জুন মাসের এই পিএমআই প্রতিবেদন আমাদের একটি সতর্কবার্তা দেয়। সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোকে স্থিতিশীল রাখতে হলে আমাদের অলস বসে থাকার সুযোগ নেই। অর্থনীতির এই মন্থর গতি কাটাতে সরকারের কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
১. উৎপাদন খাতকে সচল করতে হবে। এর জন্য কলকারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুতের সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা চাই। ডলার সংকটের সুরাহা করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য কাঁচামাল আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।
২. উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছে। এর ফলে ঋণের সুদের হার অনেক বেড়ে গেছে। এটি মূল্যস্ফীতি কমাতে কিছুটা সাহায্য করলেও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। উৎপাদনশীল খাতের জন্য কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
৩. সরকারি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে নির্মাণ খাতে অর্থের প্রবাহ বাড়বে। বেসরকারি আবাসন খাতের জন্য কর কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে।
৪. বন্দরগুলোতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস করতে হবে। লজিস্টিক সাপোর্টের উন্নয়ন এবং কর প্রশাসনের সংস্কার প্রয়োজন। এর মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমিয়ে আনতে হবে। তবেই বিশ্ববাজারে আমাদের উৎপাদন খাত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবে।
পরিশেষে বলা যায়, জুনের পিএমআই সূচক ৫২ দশমিক ৯-এ নেমে আসা কোনো স্থায়ী বিপর্যয় নয়। এটি একটি সাময়িক মন্থরতা ও সতর্কবার্তা। বাংলাদেশ অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা অতীতে দেখিয়েছে। তবে এবারের চিত্রটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রবৃদ্ধির পথ সরলরেখায় চলে না। উৎসবের ছুটি কিংবা বর্ষার বৃষ্টি সাময়িক কারণ হতে পারে। কিন্তু কাঠামোগত সংস্কার না হলে প্রবৃদ্ধির এই গতিকে ধরে রাখা যাবে না।
আসন্ন মাসগুলোতে উৎপাদন খাত যদি আবার ঘুরে দাঁড়াতে না পারে, তবে তা সামষ্টিক অর্থনীতির সামঞ্জস্য নষ্ট করবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক মডেল গড়ে তোলা। নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের যৌথ ও সমন্বিত প্রয়াসই পারে আগামী মাসগুলোতে পিএমআই সূচকের গ্রাফটিকে আবারও ঊর্ধ্বমুখী করে তুলতে।
লেখক: জাহিদুজ্জামান সাঈদ
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক
এন্ট্রাপ্রেনিউর বাংলাদেশ