• হোম > বাংলাদেশ > সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই অনুমোদন, ৭ বছরেও শেষ হয়নি ঢাকা সিটি উন্নয়ন প্রকল্প

সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই অনুমোদন, ৭ বছরেও শেষ হয়নি ঢাকা সিটি উন্নয়ন প্রকল্প

  • বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬, ১৪:৫৯
  • ৬১

---

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ ও দীর্ঘদিন অবহেলিত কয়েকটি এলাকার নাগরিক সুবিধা উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে ২০১৯ সালে শুরু হওয়া ‘ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রকল্প’ সাত বছর পেরিয়েও শেষ করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে একের পর এক নকশা পরিবর্তন, জমি হস্তান্তরে বিলম্ব, প্রশাসনিক জটিলতা, আদালতের নিষেধাজ্ঞা এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন আইএমইডির নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাধ্যতামূলক পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। পরে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে পরিকল্পনার অসামঞ্জস্য ধরা পড়ায় বারবার নকশা সংশোধন করতে হয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।

২০১৯ সালের মার্চে অনুমোদিত প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮৮০ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। বাস্তবায়নের সময়সীমা ছিল ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত। তবে কাজ শেষ না হওয়ায় দুই দফা সময় বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে।

একই সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয়ও সংশোধন করা হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, যা আগের তুলনায় প্রায় ৪২ দশমিক ৬৮ শতাংশ কম। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন রয়েছে ৩৮ কোটি ১ লাখ টাকা এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ৪৬৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।

প্রকল্পটির আওতায় কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, সূত্রাপুর-নবাবগঞ্জ-গুলিস্তান এবং খিলগাঁও-মুগদা-বাসাবো এলাকায় সড়ক, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ফুটপাত, পার্ক, খেলার মাঠ এবং কমিউনিটি সেন্টার উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্পে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও এই প্রকল্পে সেই নিয়ম পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নানা বাস্তব জটিলতা সামনে আসে, যা শুরুতেই শনাক্ত করা গেলে সময় ও ব্যয়ের অপচয় অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো।

২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৭২ শতাংশ, আর আর্থিক অগ্রগতি ৬০ দশমিক ৮০ শতাংশ। সড়ক, ড্রেন, ফুটপাত ও খেলার মাঠ উন্নয়নে কিছু অগ্রগতি দেখা গেলেও স্ট্রিট লাইট, ট্রাফিক সাইন এবং বৃক্ষরোপণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নতুন কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণের জন্য পুরোনো স্থাপনা ভেঙে ঠিকাদারের কাছে জমি বুঝিয়ে দিতে প্রায় আট মাস সময় লেগেছে। নওলাগোলা কমিউনিটি সেন্টারের ক্ষেত্রে জমি-সংক্রান্ত সামাজিক জটিলতার কারণে ভবনের নকশাতেও পরিবর্তন আনতে হয়েছে।

আইএমইডির সরেজমিন পরিদর্শনে আরও কয়েকটি নকশাগত ত্রুটি ধরা পড়ে। নওলাগোলা কমিউনিটি সেন্টারের লাইব্রেরি ও ফিশ শপের জন্য নির্ধারিত স্থানে টয়লেটের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। আবার মহানগর নাট্যমঞ্চ প্রকল্পে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, সাউন্ড সিস্টেম ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের কাজ মূল নির্মাণ প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

এছাড়া সৌরবিদ্যুৎচালিত স্ট্রিট লাইট স্থাপনের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে সাধারণ এলইডি লাইট ব্যবহার করা হয়েছে। বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রেও বন বিভাগের মতামত নেওয়ার নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ২৫টি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এসব আপত্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থের পরিমাণ ১৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

প্রকল্প ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেছে আইএমইডি। নির্ধারিত সংখ্যক প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) ও প্রকল্প পরিচালনা কমিটির (পিএসসি) সভার অর্ধেকেরও কম অনুষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি অনুমোদিত ২৮টি পদের মধ্যে এখনো ৭টি গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য রয়েছে।

আইএমইডি ভবিষ্যতের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, ভূমি জরিপ, মৃত্তিকা পরীক্ষা, হাইড্রোলজিক্যাল স্টাডি, সুস্পষ্ট এক্সিট প্ল্যান এবং শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে।

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, প্রকল্প গ্রহণের আগে যথাযথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং স্থানীয় জনগণের মতামত নেওয়া হলে বর্তমানের অনেক সমস্যাই এড়ানো যেত। তার মতে, ভবিষ্যতে বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিকল্পনা কমিশন ও বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর জবাবদিহি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে প্রকল্প পরিচালক রাজিব খাদেম জানিয়েছেন, প্রকল্পটির শুরুতে নিয়ম অনুযায়ী প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়েছিল। তবে প্রশাসনিক জটিলতা, জনবল সংকট, বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন শর্ত এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে। তিনি জানান, অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হতে পারে এবং কিছু কাজ ভবিষ্যতের নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে সম্পন্ন করার পরিকল্পনাও রয়েছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/13360 ,   Print Date & Time: Monday, 28 September 2026, 07:25:17 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh