• হোম > অর্থনীতি > বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে জটিল আন্তর্জাতিক বাধা, তদন্তে নতুন চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে জটিল আন্তর্জাতিক বাধা, তদন্তে নতুন চ্যালেঞ্জ

  • মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬, ১৩:৪৮
  • ৬৩

 

---

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে গিয়ে জটিল আন্তর্জাতিক আইনি ও আর্থিক কাঠামোর মুখোমুখি হচ্ছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। অর্থ পাচারকারীরা শেল কোম্পানি, অফশোর অ্যাকাউন্ট এবং বহু-স্তরের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সম্পদের প্রকৃত অবস্থান গোপন করায় তদন্ত কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তদন্তকারীরা পাচার হওয়া অর্থের প্রাথমিক গন্তব্য সম্পর্কে কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে পারলেও সেই অর্থ পরবর্তী সময়ে একাধিক দেশে স্থানান্তর হওয়ায় চূড়ান্ত অবস্থান শনাক্ত করা অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে। ফলে সম্পদ পুনরুদ্ধারের আইনি প্রক্রিয়াও দীর্ঘ ও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

অর্থনীতির ওপর প্রকাশিত শ্বেতপত্র অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিভিন্ন উপায়ে বিদেশে পাচার হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে চলে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিপুল অর্থ পাচারের কারণে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, কর আদায় এবং সামগ্রিক অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ সংক্রান্ত ওয়ার্কিং কমিটির ২৮তম সভায় অর্থ পাচার রোধ ও সম্পদ পুনরুদ্ধারের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সিআইডি এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

বিএফআইইউর তদন্তে ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং, থাইল্যান্ড, ভারত, লুক্সেমবার্গ, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া আইল অব ম্যান, জার্সি, গুয়ের্নসি এবং সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের মতো অফশোর আর্থিক কেন্দ্রেও পাচার হওয়া অর্থের সন্ধান মিলেছে।

ওয়ার্কিং কমিটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অর্থ পাচারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পাচারকারীদের ব্যবহার করা জটিল মাল্টি-লেয়ারিং পদ্ধতি। একাধিক দেশে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে তারা প্রকৃত মালিকানা ও সম্পদের অবস্থান আড়াল করে রাখছে। অনেক ক্ষেত্রে যেসব অ্যাকাউন্টের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে আর কোনো অর্থ অবশিষ্ট নেই; অর্থ ইতোমধ্যে অন্য ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা অফশোর কোম্পানির কাছে স্থানান্তর করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের কার্যকর দ্বিপাক্ষিক চুক্তির অভাব তদন্তকে আরও কঠিন করে তুলেছে। তাঁর মতে, পাচার হওয়া অর্থ শনাক্ত করার পাশাপাশি অভিযুক্তদের দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের আওতায় আনার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে।

সভায় জানানো হয়, বর্তমানে অর্থ পাচারের ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলার তদন্ত ও সম্পদ উদ্ধারের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে গঠিত আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্সে বিএফআইইউ, দুদক, সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

সরকার ইতোমধ্যে অর্থ পাচারের সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে ১০টি দেশ চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত পারস্পরিক আইনি সহায়তার বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ড আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর আওতায় সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত দেশে ও বিদেশে মিলিয়ে প্রায় ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। অর্থ পাচারের অভিযোগে ১৪২টি মামলা দায়ের, ১৫টি অভিযোগপত্র দাখিল এবং ৬টি মামলায় রায় হয়েছে।

সরকার বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি দেওয়ানি আইনি প্রক্রিয়াও অনুসরণ করছে। দেশের প্রায় ৩০টি ব্যাংক আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ৯টি আইন সংস্থাকে “নো-উইন, নো-ফি” ভিত্তিতে নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে বিদেশে থাকা পাচারকৃত সম্পদ শনাক্ত ও পুনরুদ্ধার করা যায়।

ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে ভার্চুয়াল সম্পদ ও ক্রিপ্টোকারেন্সির অপব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। যদিও বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি নিষিদ্ধ, তবুও অনলাইন জুয়া ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনে এর ব্যবহার বাড়ছে বলে সভায় জানানো হয়। এ বিষয়ে বিএফআইইউ, সিআইডি ও দুদকের যৌথ প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, বিদেশ থেকে অবৈধ সম্পদ ফেরানো অত্যন্ত দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং জটিল প্রক্রিয়া। তাঁর মতে, সম্পদ উদ্ধারের পাশাপাশি নতুন করে অর্থ পাচার প্রতিরোধে কার্যকর আইন, প্রকৃত মালিকানার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়াই হবে সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই সমাধান।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/13245 ,   Print Date & Time: Saturday, 26 September 2026, 06:35:45 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh