• হোম > বিদেশ > চীন বাংলাদেশ ভারত যেভাবে নতুন করে মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ লিখছে

চীন বাংলাদেশ ভারত যেভাবে নতুন করে মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ লিখছে

  • মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৯
  • ৩৯

চীন বাংলাদেশ ভারত যেভাবে নতুন করে মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ লিখছে

মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে আরাকান আর্মি (এএ) আর কেবল একটি সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন নয়; বরং একটি কার্যকর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা রাখাইন রাজ্যের প্রায় পুরো নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সংগঠনটি প্রশাসন, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলে কার্যত একটি বিকল্প রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভিত্তি নির্মাণ করছে।

২০২৪ সালের শেষ নাগাদ রাখাইনের অধিকাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর আরাকান আর্মি ‘আরাকান পিপলস রেভল্যুশনারি গভর্নমেন্ট’ (এপিআরজি) গঠন করে। এরপর চিন ও কাচিন রাজ্যের পাশাপাশি মাগওয়ে, সাগাইং, আয়েয়ারওয়াদি ও বাগো অঞ্চলেও তাদের সামরিক কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। ফলে রাখাইনভিত্তিক একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী থেকে তারা এখন জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিচ্ছে।

তবে আগামী এক দশকে মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ শুধু আরাকান আর্মির সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে না। বরং চীন, ভারত ও বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানই নির্ধারণ করবে সংগঠনটির ভবিষ্যৎ অবস্থান।

রাষ্ট্র গঠনের পথে আরাকান আর্মি

সাম্প্রতিক সময়ে আরাকান আর্মি তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় কর আদায়, প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা, নিজস্ব আদালত এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা চালু করেছে। একই সঙ্গে জান্তা সরকারের আর্থিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে নিজস্ব ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও নিয়েছে।

চলতি মাসে তারা ‘লাওং পাও’ নামে একটি রাষ্ট্রীয় লটারি চালু করেছে, যা শুধু অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নয়; বরং বিকল্প রাজস্ব ব্যবস্থার সূচনা। লটারির আয়ের অর্ধেক স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে ব্যয়ের ঘোষণা দিয়ে তারা নিজেদের একটি কল্যাণমুখী প্রশাসন হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্র, পারিবারিক নিবন্ধন এবং বিচারিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও তাদের প্রশাসনিক সক্ষমতার ইঙ্গিত বহন করছে।

কনফেডারেশনের স্বপ্ন

আরাকান আর্মির প্রধান তোয়ান মারত নাইং স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি স্পষ্টভাবে না তুললেও রাখাইনের জন্য সর্বোচ্চ স্বায়ত্তশাসনভিত্তিক একটি কনফেডারেল কাঠামোর কথা বলে আসছেন।

এ ধরনের কাঠামো বাস্তবায়িত হলে রাখাইন নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে মিয়ানমারের অংশ হিসেবেই থাকবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে এবং একই সঙ্গে পূর্ণ স্বাধীনতার কারণে সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিও কমাবে।

চীন, ভারত ও বাংলাদেশের হিসাব-নিকাশ

আরাকান আর্মির উত্থান দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।

চীন এখনো সংগঠনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামরিক অংশীদার। রাখাইনের কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তার কারণে বেইজিং আরাকান আর্মির সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রেখেছে।

ভারতও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেপথ্যে আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রোহিঙ্গা সংকট। ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার ফলে ঢাকা চায় রাখাইনে এমন রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হোক, যাতে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

সবচেয়ে বড় বাধা রোহিঙ্গা সংকট

সামরিক ও প্রশাসনিক সাফল্যের পরও আরাকান আর্মির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যু।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং পশ্চিমা দেশগুলো রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে হত্যা, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। এসব অভিযোগের কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংগঠনটির গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা সংকটের গ্রহণযোগ্য সমাধান ছাড়া আরাকান আর্মির কনফেডারেশন পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক সমর্থন পাবে না।

সামনে কী অপেক্ষা করছে?

স্বল্পমেয়াদে আরাকান আর্মি রাখাইনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করবে এবং প্রশাসনিক কাঠামো সম্প্রসারণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সময়ে জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণ শহরকেন্দ্রিক হয়ে পড়তে পারে, আর গ্রামীণ এলাকায় তাদের প্রভাব আরও কমবে।

মধ্যমেয়াদে মিয়ানমারে যদি নতুন রাজনৈতিক সমঝোতার সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে আরাকান আর্মি কনফেডারেল কাঠামোর দাবিকে সামনে আনবে। চীন, ভারত ও বাংলাদেশ যদি এ বিষয়ে সমন্বিত অবস্থান নেয়, তবে রাখাইনকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের নতুন কাঠামোও গড়ে উঠতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে সম্ভাব্য চিত্র হলো একটি খণ্ডিত মিয়ানমার, যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা সীমিত থাকবে এবং বিভিন্ন জাতিগত অঞ্চল ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে। সে পরিস্থিতিতে রাখাইন সবচেয়ে সংগঠিত ও স্থিতিশীল অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।

তবে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান না হলে কিংবা আরাকান আর্মি অবৈধ অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল থেকে গেলে পুরো অঞ্চল দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং মানবিক সংকটে নিমজ্জিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে দুটি প্রশ্নের ওপর—আরাকান আর্মি কি প্রতিবেশী দেশগুলোকে বোঝাতে পারবে যে তারা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার অংশীদার? আর চীন, ভারত ও বাংলাদেশ কি নিজেদের কৌশলগত প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে উঠে রাখাইন ও রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই সমাধানে পৌঁছাতে পারবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে শুধু রাখাইনের নয়, পুরো মিয়ানমারের আগামী দিনের রাজনৈতিক বাস্তবতা।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/13241 ,   Print Date & Time: Saturday, 26 September 2026, 08:19:02 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh