![]()
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির বৈঠকে কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি ব্যক্তিগত আন্তরিকতারও একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত দেখা গেছে। বৈঠকে মোদি তাকাইচিকে ‘ছোট বোন’ বলে সম্বোধন করলে, জবাবে জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকে নিজের ‘বড় ভাই’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বুধবার নয়াদিল্লিতে পৌঁছান সানায়ে তাকাইচি। সফরের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত ভারত-জাপানের ১৬তম বার্ষিক শীর্ষ বৈঠকে দুই দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), প্রতিরক্ষা, জ্বালানি নিরাপত্তা, সামুদ্রিক সহযোগিতা, প্রযুক্তি এবং সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার মতো বিভিন্ন বিষয়ে সম্পর্ক আরও গভীর করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে।
বৈঠকের সময় দুই নেতা জাপানের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের অবদানের কথাও স্মরণ করেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির তথ্য অনুযায়ী, তাকাইচি বলেন, তিনি শিনজো আবেকে নিজের ‘বড় ভাই’ মনে করতেন। মোদির সঙ্গে আবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেই কারণেই এখন তিনিও মোদিকে ‘বড় ভাই’ হিসেবে দেখেন।
হাস্যোজ্জ্বল পরিবেশে তাকাইচি বলেন, ‘কিছুক্ষণ আগে আমাকে “সুন্দর ছোট বোন” বলা হয়েছে। আগের আলোচনায় আমরা ভাই-বোনের মতো একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম।’
শীর্ষ বৈঠক শেষে ভারত ও জাপান চারটি যৌথ ঘোষণা দেয়। এর মধ্যে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে প্রথম যৌথ উন্নয়ন প্রকল্পের চুক্তি অন্যতম। পাশাপাশি সামুদ্রিক নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্বালানি স্থিতিশীলতা ও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও সমঝোতা হয়েছে।
তাকাইচি জানান, দুই দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ১২০টি ব্যবসায়িক চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। এসব চুক্তির আওতায় ভারতে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ইয়েন, অর্থাৎ প্রায় ১২ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে গত বছর মোদির জাপান সফরের সময় আগামী কয়েক দশকে ভারতে ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, এবারের বৈঠকে সেই লক্ষ্যের বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো নতুন ঘোষণা আসেনি।
তাকাইচি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ভারত ও জাপানের পারস্পরিক সহযোগিতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দুই দেশ একে অপরের সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে আরও শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ অংশীদারত্ব গড়ে তুলবে।
অন্যদিকে মোদি জানান, দুই দেশ নৌবাহিনীর রেডিও অ্যান্টেনা ব্যবস্থা উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জাহাজ নির্মাণ, বায়োগ্যাস, সেমিকন্ডাক্টর এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি খাতে যৌথভাবে কাজ করবে।
তিনি বলেন, আগামী এক দশকের মধ্যে ভারতে জাপানের মোট বিনিয়োগ ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েনে উন্নীত করা এবং দেশে কার্যরত জাপানি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মোদি আরও বলেন, আঞ্চলিক শান্তি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ভারত ও জাপান যৌথভাবে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়নের উদ্যোগ নেবে।
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, প্রায় ১২০টি ব্যবসায়িক চুক্তির মাধ্যমে ভারতে ২ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের পরিকল্পনাকে দুই দেশের শীর্ষ নেতারা স্বাগত জানিয়েছেন।
তাকাইচির সফরে তার সঙ্গে ৫০ জনেরও বেশি জাপানি ব্যবসায়ী, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ভারতে এসেছেন। প্রতিনিধি দলে সুজুকি মোটর, টয়োটা, ইতোচু করপোরেশনসহ অটোমোবাইল, সেমিকন্ডাক্টর, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।
বর্তমানে জাপান ভারতের অন্যতম বৃহৎ বিদেশি বিনিয়োগকারী। মুম্বাই-আহমেদাবাদ উচ্চগতির রেল প্রকল্পসহ একাধিক বড় অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দেশটি অর্থায়ন করছে। ভারতে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জাপানি প্রতিষ্ঠান ব্যবসা পরিচালনা করছে, যার প্রায় অর্ধেকই উৎপাদন খাতের সঙ্গে যুক্ত।
এই সফর এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন ভারত উৎপাদনশিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও বিরল খনিজের ক্ষেত্রে চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জাপানের মতো অংশীদারদের সঙ্গে সরবরাহব্যবস্থা বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে কয়েক বছরের উত্তেজনার পর বেইজিংয়ের সঙ্গেও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে নয়াদিল্লি।
অন্যদিকে, চীন ইস্যুতে সানায়ে তাকাইচির অবস্থান বরাবরই কঠোর। গত নভেম্বরে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, চীন যদি তাইওয়ানে সামরিক হামলা চালায়, তাহলে জাপানও সামরিক পদক্ষেপে অংশ নিতে পারে। তার ওই বক্তব্যের পর বেইজিং তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল।