ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
গত বছর রাশিয়ার সেনাবাহিনীকে গোপনে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছে চীন বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স। সংস্থাটির হাতে আসা কিছু গোপন নথি এবং দুই ইউরোপীয় কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে রাশিয়ার সেনাদের জন্য চীনে বিশেষ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছিল। তবে এ অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে বেইজিং।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলোসভের অনুমোদনে ২০২৫ সালের আগস্টে একটি প্রতিনিধিদল চীনে যায়। সেখানে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) সামরিক স্থাপনায় কয়েকটি বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেয় রুশ সেনারা।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রশিক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল তেজস্ক্রিয়, রাসায়নিক ও জৈব (সিবিআরএন) প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বেইজিংয়ের একটি সামরিক স্থাপনায় তিন সপ্তাহব্যাপী এই প্রশিক্ষণে রুশ সেনাদের রাসায়নিক ও তেজস্ক্রিয় দূষণ শনাক্তকরণ, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং দূষিত পরিবেশে কার্যক্রম পরিচালনার কৌশল শেখানো হয়।
রয়টার্সের হাতে থাকা নথিতে প্রশিক্ষণের বিভিন্ন ছবি ও বিবরণও রয়েছে। সেখানে দেখা যায়, চীনা প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে রুশ সেনারা পারমাণবিক স্থাপনার মডেল ব্যবহার করে বিভিন্ন অনুশীলনে অংশ নিচ্ছেন।
ইউরোপীয় এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই ধরনের সংবেদনশীল সামরিক প্রশিক্ষণে উভয় দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে মস্কো ও বেইজিং তাদের সামরিক সহযোগিতাকে কৌশলগত গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইউক্রেন সংকট নিয়ে তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে এবং রয়টার্সে প্রকাশিত অভিযোগগুলো “সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন”।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত মাসেও রয়টার্স দাবি করেছিল যে চীন প্রায় ২০০ রুশ সেনাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, যাদের মধ্যে কয়েকজন পরবর্তীতে ইউক্রেন যুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন। সে সময়ও চীন অভিযোগ অস্বীকার করেছিল।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কায়া কালাস সম্প্রতি জানিয়েছেন, ব্রাসেলস নিজস্ব সূত্রের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করছে এবং এর সম্ভাব্য নিরাপত্তাগত প্রভাব মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
রাশিয়া-চীনের এই সামরিক সহযোগিতা ইউরোপে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়াকে প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। একই সময়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার হওয়ায় বিষয়টি কূটনৈতিকভাবেও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
রয়টার্সের দেখা নথিতে চীনের আধুনিক সামরিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, উন্নত প্রযুক্তি এবং সিমুলেটর ব্যবহারের প্রশংসা করা হলেও বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতার ঘাটতির বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেনে দীর্ঘদিন যুদ্ধ করার কারণে রুশ সেনাবাহিনী বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতায় অনেক এগিয়ে রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে রুশ পার্লামেন্টের প্রতিরক্ষা কমিটির প্রধান আন্দ্রেই কার্তাপোলভ এসব অভিযোগকে “সম্পূর্ণ অর্থহীন” বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তার দাবি, রুশ সেনাবাহিনীর চীনের কাছ থেকে শেখার মতো কিছু নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে রাশিয়া ও চীনের ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে নতুন ভারসাম্য খুঁজে বের করতে হতে পারে।