• হোম > বাণিজ্য > ঋণ নয়, সরকারি বন্ডেই এখন ব্যাংকের সবচেয়ে বেশি আয়

ঋণ নয়, সরকারি বন্ডেই এখন ব্যাংকের সবচেয়ে বেশি আয়

  • বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬, ২০:৪২
  • ৩৮

---

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

একসময় দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আয়ের প্রধান উৎস ছিল ঋণ বিতরণ। তবে মাত্র চার বছরের ব্যবধানে সেই চিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন ঋণ নয়, বরং সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ থেকেই সবচেয়ে বেশি মুনাফা করছে ব্যাংকগুলো। ব্যাংকগুলোর সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এমন তথ্য।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি এবং আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে ধীরগতির কারণে ব্যাংকগুলোর সুদভিত্তিক আয় (নেট ইন্টারেস্ট ইনকাম) ও কমিশন আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণের পরিবর্তে নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে ঝুঁকছে ব্যাংকগুলো।

চার বছরে আমূল বদল

২০২১ সালে দেশের ৫২টি প্রধান ব্যাংকের মোট আয়ের ৪৭ শতাংশ এসেছিল ঋণের সুদ থেকে। সরকারি সিকিউরিটিজ ও অন্যান্য বিনিয়োগ থেকে আয় ছিল ৩৪ শতাংশ এবং কমিশনভিত্তিক আয় ছিল ১৯ শতাংশ।

২০২২ ও ২০২৩ সালে বিনিয়োগ থেকে আয় বাড়লেও ঋণভিত্তিক আয় তখনও শীর্ষে ছিল। তবে ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে আয় ঋণের সুদকে ছাড়িয়ে যায়।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ২০২৫ সালে। ওই বছরে ব্যাংকগুলোর মোট আয়ের মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশ আসে ঋণের সুদ থেকে। বিপরীতে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডসহ বিভিন্ন বিনিয়োগ থেকে আয় দাঁড়ায় মোট আয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশ। বাকি প্রায় ২০ শতাংশ আসে কমিশন ও অন্যান্য উৎস থেকে।

কেন বদলে গেল ব্যাংকের আয়ের চিত্র?

ব্যাংকারদের মতে, বর্তমানে ঋণ বিতরণ আগের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় বিপুল পরিমাণ ঋণ থেকে কোনো সুদ আদায় করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে আমানতকারীদের সুদ পরিশোধ ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ঋণ ব্যবসার লাভের মার্জিনও সংকুচিত হয়েছে।

একই সঙ্গে আমদানি কমে যাওয়ায় এলসি খোলা, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং অন্যান্য ব্যাংকিং সেবা থেকে কমিশন আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, দীর্ঘমেয়াদে একটি ব্যাংকের প্রধান আয়ের উৎস হওয়া উচিত ঋণ বিতরণ। কিন্তু খেলাপি ঋণের চাপ ব্যাংকগুলোকে নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ভবিষ্যতে সরকারি বন্ডের সুদের হার কমে গেলে ব্যাংকগুলো নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

অন্যদিকে শান্তা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মনিরুল ইসলাম বলেন, ট্রেজারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে ঝুঁকি কম এবং মুনাফা বেশি থাকায় ব্যাংকগুলো স্বাভাবিকভাবেই সেদিকে ঝুঁকেছে। তবে এ প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে বেসরকারি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করবে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বাণিজ্য ও শেয়ারবাজারেও প্রভাব

বিশেষজ্ঞদের মতে, আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর কমিশন আয় কমেছে। পাশাপাশি শেয়ারবাজারে লেনদেন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ায় যেসব ব্যাংকের ব্রোকারেজ হাউস রয়েছে, তারাও কমিশন আয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল ১ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা। যা ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২৫ সালে মাত্র ৫১ কোটিতে নেমে এসেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকগুলো যদি উৎপাদনশীল খাতে ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে সরকারি সিকিউরিটিজেই বেশি বিনিয়োগ করতে থাকে, তাহলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/13005 ,   Print Date & Time: Monday, 17 August 2026, 05:11:10 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh