![]()
ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের সময় হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পিত ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ মিশনে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানায় সৌদি আরব। রিয়াদের এই অবস্থান শুধু একটি সামরিক পরিকল্পনাই ভেস্তে দেয়নি, বরং মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কৌশল নিয়ে ওয়াশিংটন ও সৌদি আরবের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মতপার্থক্যও স্পষ্ট করেছে।
যুদ্ধের শুরুতে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সচল রাখতে মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা করে পেন্টাগন। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেয়, এই অভিযানে মার্কিন বাহিনী তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে পারবে না। তাদের অভিযোগ ছিল, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করেনি।
এ সিদ্ধান্তের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মধ্যে একাধিক উচ্চপর্যায়ের ফোনালাপ হয়। ট্রাম্প ছাড়াও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারও যুবরাজের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু সৌদি যুবরাজ নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেননি। তার আশঙ্কা ছিল, মার্কিন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে যুদ্ধ আবারও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত করতে বাধ্য হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা সৌদি আরবের কৌশলগত অবস্থানের বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ওয়াশিংটনের আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউট-এর গবেষক হুসেইন ইবিশ বলেন, সৌদি নেতৃত্বের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রকে অতিরিক্ত সামরিক সুবিধা দিলে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে সৌদি আরব।
যুদ্ধ চলাকালে সৌদি আরব এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণ করে। একদিকে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে কূটনৈতিক ও সীমিত নিরাপত্তা সহায়তা দিয়েছে, অন্যদিকে সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা এড়িয়ে গেছে। একই সময়ে তারা পাকিস্তান, চীনসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত ইরান-সৌদি কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংলাপের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
বর্তমানে সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে শুধু পারমাণবিক ইস্যু নয়, বরং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থন নিয়েও আলোচনা করছে। সৌদি নেতৃত্ব এসব বিষয়কে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য পারমাণবিক কর্মসূচির চেয়েও বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, যুদ্ধ শুরুর আগে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পকে সংঘাতের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। আবার যুদ্ধের এক পর্যায়ে তিনি ইরান সরকারের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়। যদিও সৌদি সরকার এ তথ্য অস্বীকার করেছে। যুদ্ধের পরিস্থিতি পরিবর্তিত হওয়ার পর সৌদি নেতৃত্ব বরং সমঝোতা ও উত্তেজনা প্রশমনের ওপর জোর দেয়।
বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে একটি বিস্তৃত চুক্তির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ এমন একটি সমাধান চায়, যা ভবিষ্যতে ইরান, ইসরায়েল কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন কোনো সংঘাত শুরু হলেও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
২০১৯ সালে সৌদি তেল স্থাপনায় হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রতিক্রিয়া না দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকেই ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে রিয়াদের সন্দেহের শুরু। সাম্প্রতিক যুদ্ধ সেই সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে। এখন সৌদি নেতৃত্ব প্রশ্ন তুলছে, ভবিষ্যতে কোনো আঞ্চলিক সংকটে যুক্তরাষ্ট্র আদৌ তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কি না।
তবে এই মতপার্থক্যের মধ্যেও দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। সৌদি আরবে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি চালুর বিষয়ে দুই দেশ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির বিকল্প বাণিজ্যিক রুট তৈরি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং অস্ত্র বিক্রিও অব্যাহত রয়েছে। সৌদি আরব এখনও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র ক্রেতা এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগও আগের মতোই সক্রিয় রয়েছে।
তবুও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সৌদি আরব আর এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না। বরং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা বহুমুখী কূটনীতি ও আঞ্চলিক ভারসাম্যের নীতিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।