![]()
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম শুধু ইতিহাসের অংশ নন, তিনি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও অনুপ্রেরণার এক অনন্য উৎস বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, নজরুল আমাদের যাপিত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাহিত্য, সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ, রাজনৈতিক চেতনা ও মানবিক দর্শনে তার প্রভাব আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) বাংলাদেশ সচিবালয়ে ভার্চুয়ালি আয়োজিত বছরব্যাপী ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২০২৭’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, প্রতিটি রাষ্ট্র ও সমাজে এমন কিছু ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব জন্ম নেন, যারা একটি জাতির চিন্তা, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেন। কাজী নজরুল ইসলাম তেমনই একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। কৈশোর থেকে পরিণত বয়স পর্যন্ত মানুষের জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে তার সাহিত্য ও দর্শনের প্রভাব অনুভূত হয়।
সরকার ২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মে পর্যন্ত সময়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি কবির স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ হিসেবে ঘোষণার সম্ভাবনাও যাচাই করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্রোহ, প্রেম, বিরহ, তারুণ্য এবং মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। পরাধীনতা, শোষণ, বৈষম্য, কুসংস্কার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার কলম ছিল এক শক্তিশালী অস্ত্র। ইসলামী সংগীত, ভজন, শ্যামাসংগীত, প্রেম, প্রকৃতি কিংবা মানবিক মূল্যবোধ—সাহিত্যের প্রতিটি ধারাতেই তিনি অনন্য অবদান রেখে গেছেন।
তিনি আরও বলেন, মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা, স্বাধীনতার চেতনা এবং সাম্যের আদর্শে নজরুল আজও জাতির পথপ্রদর্শক। মহান মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগ্রামে তার কবিতা ও গান মানুষের সাহস ও প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল।
নতুন প্রজন্মের কাছে নজরুলকে আরও বেশি করে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে তরুণদের সামনে যেমন জ্ঞানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে, তেমনি নৈতিক অবক্ষয়ের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। এমন বাস্তবতায় নজরুলের ‘আমি হবো সকাল বেলার পাখী’ কিংবা ‘থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে’–এর মতো সৃষ্টিগুলো নতুন প্রজন্মকে নৈতিকতা, মানবিকতা ও মুক্তচিন্তার পথে অনুপ্রাণিত করতে পারে।
অনুষ্ঠানের আয়োজন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নজরুল বর্ষ উদযাপনে সরকারি কর্মকর্তাদের তুলনায় নজরুল গবেষক, শিল্পী ও অনুরাগীদের সম্পৃক্ততা আরও বেশি হওয়া উচিত। তিনি বলেন, যেমন সামাজিক কর্মসূচিতে গবেষকদের উপস্থিতি অপ্রাসঙ্গিক, তেমনি নজরুলকে কেন্দ্র করে আয়োজিত অনুষ্ঠানের মূল কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত কবিপ্রেমী মানুষদের।
নিজের মূল্যায়নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তার কাছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলেন ‘বাংলাদেশের মন’। তিনি আজীবন সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার গান গেয়েছেন, যেখানে ধর্ম-বর্ণের কোনো বিভাজন নেই। সরকারও এমন একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনে কাজ করছে, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ নিরাপদে বসবাস করবে এবং সব প্রাণীর প্রতিও মানবিক আচরণ নিশ্চিত হবে।
তিনি বছরব্যাপী ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে সাহিত্য সম্মেলন, গবেষণা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক উৎসব, নজরুলসংগীতের আসর, নাট্যোৎসব ও চিত্রপ্রদর্শনীসহ বিভিন্ন কর্মসূচি সফলভাবে আয়োজনের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে বিপথগামিতা থেকে রক্ষা করতে নজরুলের সাহিত্য ও মানবিক চেতনাকে সমাজে আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানের শেষে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, সাহিত্য ও মানবিক আদর্শের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২০২৭’-এর বছরব্যাপী কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ স্মারক ডাকটিকিট ও লোগো উন্মোচন করা হয় এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সরকারি কর্মকর্তা, নজরুল গবেষক ও শিল্পীরা ভার্চুয়ালি অংশ নেন।