পশ্চিমবঙ্গে ‘অ্যান্টি-গুন্ডা বিল’ পাস, প্রশাসনের ক্ষমতা বৃদ্ধি নিয়ে বিতর্ক
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাকটিভিটিজ বিল, ২০২৬’ পাস হয়েছে। ‘অ্যান্টি-গুন্ডা বিল’ নামে পরিচিত এই আইনের মাধ্যমে সংগঠিত অপরাধ ও জনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী কর্মকাণ্ড দমনে প্রশাসনের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।
তবে বিলটি পাসের পরই নাগরিক অধিকার, নির্বাহী ক্ষমতার বিস্তার এবং সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়ে রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
কী থাকছে নতুন আইনে?
নতুন আইনে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ কমিশনার অথবা রাজ্য সরকারের অনুমোদিত ডিআইজি পদমর্যাদার কোনো কর্মকর্তা যদি মনে করেন যে কোনো ব্যক্তি ‘গুন্ডা’ হিসেবে অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত বা ভবিষ্যতে জড়াতে পারেন, তাহলে তাকে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা, জেলা বা একাধিক জেলায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারবেন।
এছাড়া ওই ব্যক্তিকে নির্ধারিত সময় অন্তর কর্তৃপক্ষের কাছে নিজের অবস্থান জানাতে বাধ্য করা হবে।
বিচার ছাড়াই এক বছর আটক রাখার সুযোগ
আইনের সবচেয়ে আলোচিত বিধান হলো প্রতিরোধমূলক আটক। জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হলে কোনো ব্যক্তিকে বিচার ছাড়াই সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত আটক রাখার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে প্রশাসনকে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিধান ভারতের ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (এনএসএ), ১৯৮০-এর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যেখানে জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার স্বার্থে বিচার ছাড়াই এক বছর পর্যন্ত আটক রাখার সুযোগ রয়েছে।
পুলিশের ক্ষমতা আরও বাড়ছে
নতুন আইনে পুলিশের জন্য তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের বিস্তৃত ক্ষমতা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি আইনের আওতাভুক্ত অপরাধগুলোকে আমলযোগ্য ও অজামিনযোগ্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া যাদের বিরুদ্ধে আটক বা বহিষ্কারের আদেশ জারি হবে, তাদের আশ্রয় দেওয়া বা সহযোগিতা করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
‘অসামাজিক কার্যকলাপ’ কী?
আইনে ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’-এর সংজ্ঞা আগের তুলনায় আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বা নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করা;
- জীবন, ব্যক্তি বা সম্পদের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করা;
- জনশৃঙ্খলা বা জনশান্তি বিঘ্নিত করা;
- বৈধ ব্যবসা বা আইনসম্মত অধিকার প্রয়োগে বাধা দেওয়া;
- কাউকে বেআইনিভাবে সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদ করা;
- সরকারি বা ব্যক্তিগত সম্পত্তির বড় ধরনের ক্ষতি করা;
- অবৈধ খনি, বালু বা বনজ সম্পদ উত্তোলন এবং বন্যপ্রাণী পাচারের মাধ্যমে সরকারি রাজস্বের ক্ষতি করা।
‘গুন্ডা’ বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে?
বিলে ‘গুন্ডা’ বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যিনি একা বা কোনো দল, চক্র কিংবা সিন্ডিকেটের সদস্য বা নেতা হিসেবে নিয়মিত অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকেন অথবা এসব কর্মকাণ্ডে সহায়তা, অর্থায়ন বা উৎসাহ দেন।
এছাড়া ভারতীয় ন্যায় সংহিতা ২০২৩-এর নির্দিষ্ট ধারা, অস্ত্র আইন, মাদকদ্রব্য আইন, অনৈতিক পাচার (প্রতিরোধ) আইন কিংবা বিস্ফোরক উপাদান আইনের আওতায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও এই সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।
বিরোধীদের আপত্তি
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ, আইনটি প্রশাসনের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা তুলে দেবে এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বিরোধী, সামাজিক কর্মী কিংবা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’-এর বিস্তৃত সংজ্ঞার কারণে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ কিংবা নাগরিক আন্দোলনও এই আইনের আওতায় আনা হতে পারে।
সরকারের অবস্থান
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দাবি, আইনের মূল উদ্দেশ্য সংঘবদ্ধ অপরাধ, চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট কার্যক্রম এবং জনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী কর্মকাণ্ড দমন করা। সরকারের ভাষ্য, আইন মেনে চলা সাধারণ নাগরিকদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।