হামের টিকাদানে বাদ পড়েছে ৬০ লাখ শিশু? লক্ষ্যমাত্রার বড় গরমিল নিয়ে উদ্বেগ
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশব্যাপী হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে বড় ধরনের অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য হামের টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ কোটি ৮০ লাখের কিছু বেশি। অথচ একই বয়সী শিশুদের জন্য সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি। ফলে অন্তত ৬০ লাখ শিশু হামের টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থেকে গেছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
দেশে হামের উচ্চ সংক্রমণ দেখা দেওয়ার পর গত ৫ এপ্রিল ৩০টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর ১২ এপ্রিল চারটি সিটি করপোরেশনে এবং ২০ এপ্রিল সারা দেশে এই কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (৩০ জুন) পর্যন্ত ১ কোটি ৮৪ লাখ ৭৭ হাজার ৩৯২ শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৩ শতাংশ বেশি। তবে একই সময়ে ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইনের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে তুলনা করলে প্রায় ৬০ লাখ শিশুর পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই লক্ষ্যমাত্রাগত ঘাটতির কারণেই প্রয়োজনীয় ৯৫ শতাংশ টিকা কভারেজ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে তিন মাস পার হলেও হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি এবং প্রতিদিনই নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-এর গবেষক ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, অতীতে টিকাদান কর্মসূচির আগে মাঠপর্যায়ে বাড়ি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করে প্রকৃত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতো। কিন্তু এবার সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই কর্মসূচি শুরু হওয়ায় কতজন শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে, তার সঠিক হিসাব করা সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও বলেন, ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইনের লক্ষ্যমাত্রা যেখানে ২ কোটি ৪০ থেকে ২ কোটি ৫০ লাখ শিশু, সেখানে হামের মতো প্রাণঘাতী রোগ প্রতিরোধে টিকার লক্ষ্যমাত্রা এত কম হওয়া উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, এতে প্রকৃত টিকা কভারেজ প্রায় ৭০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে, যা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট নয়।
লক্ষ্যমাত্রার এই পার্থক্যের বিষয়টি স্বীকার করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। তিনি বলেন, সংক্রমণের পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হওয়ায় প্রশাসনিক তথ্যের ভিত্তিতে তড়িঘড়ি করেই কর্মসূচি শুরু করতে হয়েছিল। তবে লক্ষ্যমাত্রার এই ব্যবধান কীভাবে তৈরি হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে।
এদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ অভিযোগ করেন, যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনার পরামর্শ দেওয়া হলেও তা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তাঁর মতে, প্রকৃত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ব্যর্থতার কারণেই এখনও প্রতিদিন হাজারের বেশি শিশু আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন ৮৬৬ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং পরীক্ষায় ১১৪ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে।
গত ১৫ মার্চ থেকে ৩০ জুন সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে হামের সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৭৭ জন। এর মধ্যে পরীক্ষায় ১১ হাজার ৯৬৫ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হামে ৯৩ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৬২৫ জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।