![]()
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হলো কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই)। এই খাত কর্মসংস্থান তৈরি করে। এটি দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ভূমিকা রাখে। আমাদের জিডিপিতে এই খাতের অবদান আছে। কিন্তু এই বিশাল সম্ভাবনার সামনে আজ বড় বাধা। প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও নথিপত্রের অভাবে অনেক উদ্যোক্তা পিছিয়ে আছেন। তারা এখনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবার বাইরে। টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সবার আগে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। অথচ পদ্ধতিগত জটিলতা ও লালফিতা তাদের পথ আটকে দিচ্ছে।
নথিপত্রের জটিলতা
আমাদের দেশের একটি বড় বাস্তবতার কথা বলা যাক। দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় নথিপত্র তৈরি করতে পারেন না। এই কারণে তারা প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হন। ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন কিংবা পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়া বেশ কঠিন। প্রতিবছর এগুলো নবায়ন করতে হয়। একজন প্রান্তিক উদ্যোক্তার জন্য এই প্রক্রিয়া পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। দেশের আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এখনো বেশ জটিল। কাগজপত্র তৈরি করতে গিয়ে অনেকে মাঝপথে হাল ছেড়ে দেন। এরপর তারা চড়া সুদের মহাজনি ঋণের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এটি দীর্ঘমেয়াদে তাদের ব্যবসাকে ঝুঁকিতে ফেলে।
এই অচলাবস্থা ভাঙা জরুরি। সনাতনী ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে এসে নতুন সমাধান খুঁজতে হবে। কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান এখন নতুন মডেল নিয়ে কাজ করছে। তারা গ্রাহককে বারবার শাখায় আসার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দিচ্ছে। নির্দিষ্ট রিলেশনশিপ ম্যানেজার (আরএম) সরাসরি উদ্যোক্তার দোরগোড়ায় যাচ্ছেন। তারা কাগজপত্র সংগ্রহ ও যাচাই করছেন। জামানতবিহীন ক্ষুদ্র ঋণের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। ‘স্ট্রেইট থ্রু প্রসেসিং’ বা এসটিপি পদ্ধতির মাধ্যমে দ্রুত ঋণ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে যোগ্য গ্রাহকেরা মাত্র দু-তিন কার্যদিবসে ঋণ পাচ্ছেন। এই মডেল প্রমাণ করে যে, সদিচ্ছা ও প্রযুক্তির ব্যবহারে লালফিতার দৌরাত্ম্য কমানো যায়।
নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের বিশেষ সুবিধা
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের বড় হাতিয়ার নারী ও তরুণ সমাজ। বর্তমানে মোট এসএমই ঋণের একটি বড় অংশ নারী উদ্যোক্তাদের দেওয়া হচ্ছে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের অনেক সামাজিক বাধা থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারী উদ্যোক্তাদের নামে নিজস্ব স্থাবর সম্পত্তি বা জামানত থাকে না। আর ব্যাংকগুলো জামানত ছাড়া ঋণ দিতে চায় না।
এই বাধা দূর করতে জামানতবিহীন ঋণের পরিধি বাড়ানো দরকার। ব্যবসার ধরন বুঝে ঋণের কিস্তি নির্ধারণ করা উচিত। একে বলা হয় ‘স্ট্রাকচার্ড ঋণ’। আবার মৌসুমভিত্তিক ব্যবসার জন্য রয়েছে ‘মৌসুমি ঋণ’। এই ঋণে শুরুতে শুধু সুদ পরিশোধ করা যায়। মৌসুম শেষে মূল টাকা দেওয়ার সুযোগ থাকে। এটি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বড় স্বস্তি দেয়। কেবল ঋণ দেওয়াই শেষ কথা নয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নারীদের জন্য বিশেষায়িত ডেস্ক থাকা দরকার। নারী রিলেশনশিপ ম্যানেজার থাকলে উদ্যোক্তারা সহজে কথা বলতে পারেন। এর পাশাপাশি মেলার মাধ্যমে তাদের উৎপাদিত পণ্যের বাজার সংযোগ তৈরি করাও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
নীতি সংস্কার ও ডিজিটাল সেবা
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্যোক্তাদের কাগজপত্র তৈরিতে সহায়তা করছে। তারা আর্থিক সচেতনতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। তবে এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। টেকসই পরিবর্তনের জন্য বড় ধরনের নীতি সংস্কার প্রয়োজন। ঢাকা সিটি করপোরেশন পাঁচ বছর মেয়াদি ট্রেড লাইসেন্স দিচ্ছে। ডিজিটাল সনদের এই উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এই সুবিধা ঢাকার বাইরেও নিয়ে যেতে হবে। দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে এই সেবা বিস্তৃত করা জরুরি।
বিশেষ করে পরিবেশগত ছাড়পত্র বা কারখানা লাইসেন্সের প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। এই সেবাগুলোকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা দরকার। একটি ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের আওতায় এগুলো আনা উচিত। একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা যেন ঘরে বসেই সব লাইসেন্স পেতে পারেন। নথিপত্রের এই সহজীকরণ ঘটলে ব্যাংকগুলোর পক্ষেও দ্রুত ঋণ দেওয়া সম্ভব হবে।
সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ক্লাস্টার মডেল
একটি ব্যবসার প্রবৃদ্ধির জন্য শুধু মূলধন যথেষ্ট নয়। সঠিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা জানা জরুরি। হিসাবরক্ষণ এবং বিপণন কৌশলও শিখতে হয়। আমাদের দেশের অনেক ভালো উদ্যোগ সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে বন্ধ হয়ে যায়। তাই ঋণগ্রহীতাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত। এটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব। সফল উদ্যোক্তাদের স্বীকৃতি দেওয়া হলে নতুনরা উৎসাহ পান। এসএমই পুরস্কারের মতো আয়োজন এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।
এর পাশাপাশি ‘ক্লাস্টারভিত্তিক অর্থায়ন’ মডেলটি বেশ কার্যকর। যেমন কেরানীগঞ্জের শীতবস্ত্র প্রস্তুতকারক বা বগুড়ার লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প। এই নির্দিষ্ট অঞ্চলের ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোকে বিশেষ লোন দেওয়া যায়। এতে উৎপাদন খরচ কমে। পণ্যের মানোন্নয়ন সহজ হয়।
বৈশ্বিক সংকট ও করণীয়
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বেশ কঠিন। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সিএমএসএমই খাত চাপে আছে। কাঁচামালের দাম ও উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের টিকে থাকাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এই সময়ে অর্থপ্রবাহ সচল রাখা প্রয়োজন। এ জন্য ‘ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্সিং’ বা মিশ্র অর্থায়ন মডেল ব্যবহার করা যায়। এখানে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও বাণিজ্যিক ব্যাংক একসঙ্গে কাজ করে।
বর্তমানে দেশে অনেক ফেসবুকভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসা গড়ে উঠেছে। এগুলো বিচ্ছিন্নভাবে চলায় সঠিক নীতি সহায়তা পাচ্ছে না। এই ব্যবসাগুলোকে একটি ‘জাতীয় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম’-এর আওতায় আনা দরকার। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের উদ্যোক্তারা বড় বাজার পাবেন। তদুপরি, বর্তমান জ্বালানি সংকটের কারণে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। ক্ষুদ্র শিল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারে সহজ শর্তে ‘সবুজ অর্থায়ন’ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পরিশেষে,ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত কেবল কর্মসংস্থান তৈরি করে না। এটি দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য কমায়। তাই এসএমই খাতকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে রাখা ঠিক হবে না। ব্যাংকিং খাতের উচিত প্রথাগত মানসিকতা বদলানো। গ্রাহকবান্ধব ও সহজ প্রক্রিয়ায় ঋণ বিতরণ করা এখন সময়ের দাবি। সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। নথিপত্রের জটিলতা দূর করা গেলে এবং নারী ও তরুণদের অর্থায়ন নিশ্চিত হলে অর্থনীতি মজবুত হবে। জটিলতাহীন ও গতিশীল এসএমই খাতই হোক আমাদের আগামীর ভরসা।
লেখক: জাহিদুজ্জামান সাঈদ
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক
এন্টারপ্রেনার বাংলাদেশ