![]()
জাহিদুজ্জামান সাঈদ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর শেষ হয়েছে। এই সফরের পর দেশের অর্থনীতিতে একটি বড় আশার আলো দেখা যাচ্ছে। চীনের ১১টি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। এই বিনিয়োগের মোট পরিমাণ প্রায় ৯২১ কোটি মার্কিন ডলার। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই অঙ্কটি নিঃসন্দেহে বড়।
প্রস্তাবিত খাতের তালিকায় রয়েছে বৈচিত্র্যের ছাপ। এর মধ্যে আছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উন্নয়ন। আরও আছে ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন। হাই-টেক ব্যাটারি ও লজিস্টিকস খাতের মতো আধুনিক বিষয়ও এখানে অন্তর্ভুক্ত। তবে একটি বড় প্রশ্ন অবহারিতভাবেই সামনে আসে। এই বিশাল প্রস্তাবের কতটা বাস্তবে রূপান্তর করা সম্ভব? আমাদের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কি এই চাপ সামলানোর জন্য প্রস্তুত?
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেছেন, এই প্রস্তাবগুলো একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ের। এর কোনো গ্যারান্টি এখনই দেওয়া যাচ্ছে না। এই সতর্কবার্তা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। অতীতেও আমরা বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক সফরের পর বড় বড় বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেখেছি। কিন্তু তার সবকটি পরে আলোর মুখ দেখেনি। তাই এবার অতি-উত্সাহ বর্জন করতে হবে। আমাদের প্রয়োজন গভীর আত্মানুসন্ধান ও সঠিক কৌশলগত পরিকল্পনা।
প্রস্তাবিত বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় অংশ আসবে সড়ক খাতে। সিচুয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ গ্রুপ প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে চায়। তারা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি মডেলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সক্ষমতা বাড়াতে আগ্রহী। এই মহাসড়কটি দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন। এর উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি। সরকার নিজেই এই সড়কের উন্নয়নে ৭১ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ভাবছে। সেতু বিভাগও এখানে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে করতে চায়। এই অবস্থায় চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবটি একটি বড় বিকল্প হতে পারে।
তবে এর পেছনে একটি ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণও আছে। চীন সরকার কুনমিং থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত একটি সংযোগ পথ চায়। এই পথটি কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দরকে যুক্ত করবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক উন্নয়ন এই পরিকল্পনারই অংশ হতে পারে। আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়লে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাড়বে। তবে এই বড় অবকাঠামো ঋণের শর্তগুলো খুব ভালোভাবে যাচাই করা দরকার। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর যেন বাড়তি চাপ না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও টেকসই উন্নয়ন
এই বিনিয়োগ প্রস্তাবের একটি ভালো দিক হলো খাতের বৈচিত্র্য। প্রথাগত পোশাক খাতের বাইরে গিয়ে এবার পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে জোর দেওয়া হয়েছে। যেমন, ঝংশিন এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন গ্রুপ পায়রা বন্দরে ১৬৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে চায়। তারা সেখানে একটি অত্যাধুনিক ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং শিল্প গড়ে তুলবে। আবার সাংহাই এনভায়রোমেন্ট কোম্পানি ৮০ কোটি ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। তারা বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায়। এই প্রকল্পগুলো ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় হবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে ইলেকট্রনিক বর্জ্যের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। আমাদের বড় শহরগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি বড় সমস্যা। বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের এই মডেল সফল হলে পরিবেশ রক্ষা পাবে। এটি আমাদের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি অর্জনে সাহায্য করবে। একইভাবে হুয়াসিন টেক্সটাইলসের রিসাইকেল তুলা ও লিথিয়াম ব্যাটারি তৈরির প্রস্তাবও আধুনিক যুগের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
কর্মসংস্থান, কৃষি ও শিক্ষা খাতের সম্ভাবনা
চীনা বিনিয়োগের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো ভেষজ উদ্ভিদ চাষ প্রকল্প। শানডং ঝংশিন ফার্মাসিউটিক্যাল এই খাতে ১৯ কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে চায়। এই প্রকল্পের জন্য ২৫ হাজার বিঘা জমির প্রয়োজন হবে। এখানে উৎপাদিত সব ভেষজ পণ্য চীনে রপ্তানি করা হবে। এই মেগা প্রকল্পে প্রায় ৫০ হাজার স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে এটি একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে এর জন্য জমির সঠিক ব্যবহার ও কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
পাশাপাশি, চায়না কেপেল এডুকেশন গ্রুপ ২৭ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। তারা আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন করতে চায়। বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আসার ক্ষেত্রে দক্ষ জনবলের অভাব একটি বড় বাধা। কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে যদি যুবসমাজকে দক্ষ করা যায়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সব খাতের জন্যই ভালো হবে।
বড় চ্যালেঞ্জ: আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
৯২১ কোটি ডলারের এই বিশাল প্রস্তাবের সামনে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ আছে। প্রধান বাধা হতে পারে আমাদের আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা। এর সঙ্গে আছে ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা এবং নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাব। ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান কখনোই খুব ভালো ছিল না। একটি বিদেশি কোম্পানি যখন বিনিয়োগ করে, তখন তারা দ্রুত সেবা চায়। বাংলাদেশে এখনো একটি কারখানা চালু করতে অনেকগুলো লাইসেন্স লাগে। এই ছাড়পত্র পেতেই বছরের পর বছর ঘুরে কেটে যায়।
দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ হলো মোংলা ও পায়রা বন্দরের সক্ষমতা। সিসিসিইসিসি কোম্পানি মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৬৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। আবার এসএফ এক্সপ্রেস ১৮ কোটি ডলার বিনিয়োগে কোল্ড চেইন লজিস্টিকস করতে চায়। এই প্রকল্পগুলোর সাফল্য নির্ভর করবে আমাদের বন্দরগুলোর কার্যক্ষমতার ওপর। শুল্কায়ন প্রক্রিয়া দ্রুত ও আধুনিক না হলে এই বিনিয়োগের সুফল পাওয়া যাবে না।
তাছাড়া, ভোলা থেকে গ্যাস উত্তোলনের জন্য ২৫ কোটি ডলারের একটি প্রস্তাব আছে। চায়না ফিউচার এনার্জি গ্রুপ বাপেক্সের সঙ্গে যৌথভাবে এই কাজ করতে চায়। এখানে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা ও চুক্তি বা পিএসসির শর্তাবলি দেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে দ্রুত চূড়ান্ত করা একটি বড় পরীক্ষা।
আমাদের করণীয় ও রোডম্যাপ
বিনিয়োগের এই বড় সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বাংলাদেশকে দ্রুত তিনটি পদক্ষেপ নিতে হবে:
১. বিডা, বেজা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করতে হবে। এই কমিটির কাজ হবে আগামী ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে প্রতিটি প্রস্তাবের কারিগরি ও অর্থনৈতিক দিক মূল্যায়ন করা।
২. চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য নির্ধারিত অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি বরাদ্দ দ্রুত করতে হবে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত করা জরুরি।
৩. বিনিয়োগের শর্তগুলো যেন একপেশে না হয়। স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য দক্ষ ও পেশাদার প্যানেল দিয়ে দর-কষাকষি করতে হবে।
পরিশেষে, প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফর বাংলাদেশের সামনে বিনিয়োগের একটি বড় দুয়ার খুলে দিয়েছে। ৯২১ কোটি ডলারের এই প্রস্তাব প্রমাণ করে যে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের বাজারের গুরুত্ব আছে। কিন্তু প্রস্তাব আসাই শেষ কথা নয়। আসল কাজ শুরু হয় বাস্তবায়নের মাঠে। আমরা যদি আমাদের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থার সংস্কার করতে না পারি, তবে এই বিনিয়োগ আসবে না। নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বাড়ানো এখন জরুরি। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, এই সুযোগ হাতছাড়া করার বিলাসিতা দেখানোর মতো অবস্থায় আমাদের অর্থনীতি এখন নেই। বেইজিংয়ের এই প্রস্তাবকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে আমাদের নিজেদের।
লেখক: জাহিদুজ্জামান সাঈদ
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক
এন্টারপ্রেনার বাংলাদেশ