![]()
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর বেঙ্গল শিল্পালয়ে শুরু হয়েছে ‘সহাবস্থানের স্থাপত্য: বঙ্গীয় ব-দ্বীপে জনপরিসরের স্থানিক আখ্যান’ শীর্ষক একটি ব্যতিক্রমধর্মী শিল্প ও স্থাপত্য প্রদর্শনী। ব্রিটিশ কাউন্সিলের ‘Women of the World (WOW) Bangladesh 2026’-এর কমিশন ও গ্র্যান্টস প্রোগ্রামের সহায়তায় এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় আয়োজিত এই আন্তঃবিষয়ক প্রদর্শনী ২৭ জুন থেকে আগামী ২৫ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত চলবে। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রদর্শনীটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
প্রদর্শনীটির উদ্বোধন করেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে ব্রিটিশ হাইকমিশনের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার ও ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর জেমস গোল্ডম্যান এবং ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর স্টিফেন ফোর্বস।
প্রদর্শনীতে স্থপতিযুগল সায়কা ইকবাল মেঘনা ও শুভ্র শোভন চৌধুরী তাঁদের দীর্ঘ ষোল বছরের গবেষণা, পেশাগত চর্চা এবং স্থাপত্য-ভাবনাকে এক অনন্য শিল্পভাষায় উপস্থাপন করেছেন। শিল্প ও স্থাপত্যের সমন্বয়ে নির্মিত এই আয়োজন তুলে ধরেছে, কীভাবে নারীবাদী নৈতিকতা, জলবায়ু-সংবেদনশীল পরিকল্পনা এবং জনসম্পৃক্ততা বঙ্গীয় ব-দ্বীপে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও সহনশীল জনপরিসর গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রদর্শনীটি মূলত চারটি বিষয়কে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে— ‘বঙ্গীয় বদ্বীপে সংস্থাপন’, ‘চর্চা ও তত্ত্ব’, ‘স্থাপনাশিল্প: এক সংবেদীয় ইশতেহার’ এবং ‘জনপরিসরে মধ্যবর্তিতা’।
বঙ্গীয় বদ্বীপে সংস্থাপন
এই অংশে বাংলার বদ্বীপের পরিবর্তনশীল ভূপ্রকৃতি, পানি ও পলির অবিরাম রূপান্তর এবং জলবায়ুগত অনিশ্চয়তার বাস্তবতার মধ্যেই স্থাপত্যচর্চার বিকাশকে তুলে ধরা হয়েছে। প্রদর্শনীটি দেখায়, সংঘাত নয়; বরং প্রকৃতি, প্রতিবেশ, পানি এবং পরিবর্তনশীল পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন ও সহাবস্থানই ভবিষ্যতের স্থাপত্যচিন্তার মূল ভিত্তি হতে পারে।
চর্চা ও তত্ত্ব
দ্রুত নগরায়ণ, পরিবেশগত সংকট এবং সামাজিক বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে স্থপতিদ্বয় নারী-সংবেদী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক স্থাপত্যচর্চার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তাঁদের মতে, স্থাপত্য কেবল ভবন নির্মাণের বিষয় নয়; এটি সামাজিক ন্যায়, মর্যাদা, অংশীদারিত্ব, মানবিকতা এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার একটি কার্যকর মাধ্যম।
স্থাপনাশিল্প: এক সংবেদীয় ইশতেহার
প্রদর্শনীতে বর্ষা-সহিষ্ণু বিভিন্ন স্থাপনাশিল্প (Installation) প্রদর্শিত হয়েছে। হাতে তৈরি পোড়ামাটির টালি, বাঁশের দরমা, ছাউনি এবং স্থানীয় উপকরণ দিয়ে নির্মিত প্যাভিলিয়নগুলো আলো, বাতাস, বৃষ্টি ও আর্দ্রতার সঙ্গে এক জীবন্ত সম্পর্ক তৈরি করেছে। ফলে স্থাপনাগুলো শুধুমাত্র প্রদর্শনীর বস্তু নয়; বরং পরিবেশের সঙ্গে ক্রমাগত সংলাপে যুক্ত এক জীবন্ত অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে।
প্রদর্শনীতে স্থানীয় উপকরণ, কারুশিল্পের ঐতিহ্য এবং পরিবেশ-সংবেদনশীল নির্মাণপ্রযুক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে স্থাপত্য, মানুষ, স্থান এবং প্রকৃতির পারস্পরিক সম্পর্ককে নতুনভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
জনপরিসরে মধ্যবর্তিতা
প্রদর্শনীটি শুধু শিল্পালয়ের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। নির্বাচিত কিছু স্থাপনা পরবর্তীতে শহরের বিভিন্ন গণপরিসরে সাময়িক আশ্রয়স্থল, ব্রেস্টফিডিং বা নার্সিং পড এবং বিশ্রামকেন্দ্র হিসেবে স্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, লিঙ্গ-সংবেদী, জলবায়ু-সহনশীল ও মানবিক নগর-পরিবেশ গড়ে তোলার সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে।
আয়োজকদের মতে, ‘সহাবস্থানের স্থাপত্য’ প্রকল্পটি দেখায়, কীভাবে সংবেদনশীল স্থাপত্যচর্চা জলবায়ু-সহনশীল, সর্বজনীন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক গণপরিসর নির্মাণের মাধ্যমে একটি প্রাণবন্ত সমাজ ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে। একই সঙ্গে এটি শিল্প ও স্থাপত্যকে কাজে লাগিয়ে সবার জন্য অভিন্ন জনপরিসর নির্মাণের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সামনে নিয়ে আসে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জনপরিসর, নগর পরিকল্পনা ও স্থাপত্য গড়ে তুলতে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে। ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোর মাস্টার প্ল্যানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং পর্যায়ক্রমে এ পরিকল্পনা জেলা ও উপজেলা শহরেও সম্প্রসারণ করা হবে।
তিনি বলেন, প্রতিটি সরকারি প্রকল্পে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি এবং তাঁদের যথাযথ অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। শহরকে বৃষ্টি, পানি ও জলবায়ুর বাস্তবতার উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে; এগুলোকে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখলে চলবে না।
বাংলাদেশে ব্রিটিশ হাইকমিশনের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার ও ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর জেমস গোল্ডম্যান বলেন, “সহাবস্থানের স্থাপত্য প্রদর্শনীতে উপস্থিত থাকতে পেরে আমি আনন্দিত। শিল্প, স্থাপত্য ও উদ্ভাবনী চিন্তার সমন্বয়ে আয়োজিত এই প্রদর্শনী বঙ্গীয় বদ্বীপে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল জনপরিসর গড়ে তোলার নতুন ভাবনা তুলে ধরেছে। ব্রিটিশ কাউন্সিলের উইমেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড (WOW) কর্মসূচি এ ধরনের উদ্যোগকে সবসময় সমর্থন করে আসছে, যা যুক্তরাজ্যের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর অন্যতম। পাশাপাশি এটি বাংলাদেশে জলবায়ু-সংবেদনশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ।”
ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর স্টিফেন ফোর্বস বলেন, “এই প্রকল্পের অংশ হতে পেরে আমরা আনন্দিত। সৃজনশীল অর্থনীতি, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্যে সংযোগ তৈরি করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। বিশেষ করে নকশা, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সৃজনশীল অর্থনীতির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে সমাজকে অবশ্যই অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে এবং বিভিন্ন মত ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, শিল্প ও স্থাপত্যকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে সবার জন্য অভিন্ন জনপরিসর তৈরি করা যায়, সে বিষয়ে নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করবে এই প্রদর্শনী।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থপতি, শিক্ষাবিদ এবং বেঙ্গল ইনস্টিটিউট ফর আর্কিটেকচার, ল্যান্ডস্কেপস অ্যান্ড সেটেলমেন্টস-এর মহাপরিচালক অধ্যাপক কাজী খালিদ আশরাফ বলেন, “আমার কাছে এই ইনস্টলেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর নির্মাণপ্রক্রিয়া। এটি একটি সম্মিলিত প্রক্রিয়া। স্থাপত্যও মূলত সম্মিলিতভাবে গড়ে ওঠে। পোড়ামাটির টালি থেকে শুরু করে স্থানীয় উপকরণ, কারুশিল্প এবং এটি নির্মাণে যুক্ত মানুষের অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে এটি উপকরণ ও নির্মাণশৈলী নিয়ে এক ধরনের অনুসন্ধান। একই সঙ্গে এটি বর্ষা, বদ্বীপ ও জনপরিসরের মধ্যে একটি নতুন সংলাপের সূচনা করে এবং স্থাপনা, ভূদৃশ্য ও মানুষের মধ্যে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করে।”
প্রদর্শনীর কিউরেটরিয়াল উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ওয়াকিলুর রহমান ও লুভা নাহিদ চৌধুরী।
শিল্প ও সংস্কৃতির মাধ্যমে লিঙ্গসমতা এগিয়ে নেওয়া, নারী-নেতৃত্বাধীন সৃজনশীল উদ্যোগকে উৎসাহিত করা, বিভিন্ন শাখার মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে এই প্রদর্শনী একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই সমাজ গড়ে তোলা এবং বাংলাদেশের সৃজনশীল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ।