![]()
বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ঢাকার অবস্থান দিন দিন আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠছে। আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা বিশ্বমঞ্চে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই পরিবর্তিত ও উদীয়মান বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর অত্যন্ত সময়োপযোগী। এটি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে এক নতুন ও গতিশীল অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে যে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়েছে, তা ছিল সত্যিই নজিরবিহীন। সেখানে তাঁকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সশস্ত্র বাহিনীর চৌকস দল তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। দুই দেশের জাতীয় সংগীতের সুর বেইজিংয়ের আকাশকে মুখরিত করে। প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে তোপধ্বনি দেওয়া হয়। এই জাঁকজমকপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা কেবল প্রথাগত আন্তর্জাতিক সৌজন্যের অংশ নয়। এর গভীর রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। উদীয়মান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ঢাকার প্রতি বেইজিংয়ের বিশেষ কৌশলগত মূল্যায়নের এটি একটি স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ।
এই ঐতিহাসিক সফরের মূল ভিত্তি ছিল চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। অত্যন্ত ফলপ্রসূ এই আলোচনায় দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা তৈরি হয়েছে। বৈঠকে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়ে বিস্তারিত কথা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো নিয়ে গভীর আলোচনা হয়েছে।
বৈঠক শেষে দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এই সমঝোতা স্মারকগুলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনিয়োগ, কৃষি ও গণমাধ্যমের মতো বহুমুখী খাতকে কভার করেছে। কূটনীতির টেবিলে সই হওয়া এই চুক্তিগুলো দুই দেশের সম্পর্ককে বহুমাত্রিক উচ্চতায় নিয়ে যাবে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, কূটনীতির আসল সাফল্য কেবল কাগজে সই করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করে বাস্তবায়নের গতি এবং আন্তরিকতার ওপর। বেইজিংয়ের এই সফর আমাদের সামনে যেমন বিপুল সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে, ঠিক তেমনি কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও সামনে এনেছে।
সফরের অন্যতম প্রধান ও সফল অর্থনৈতিক আকর্ষণ ছিল বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে আয়োজিত বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরামের বিশেষ সম্মেলন। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এই আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে চীনের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতা, শিল্পপতি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে এক ঐতিহাসিক ও অনুপ্রেরণামূলক ভাষণ দেন। তিনি চীনা বিনিয়োগকারীদের প্রতি এক বিশেষ আহ্বান জানান। তিনি তাঁদের বাংলাদেশের আগামী দিনের অর্থনৈতিক বিস্ময় রচনার সমমর্যাদার অংশীদার হওয়ার আমন্ত্রণ জানান।
বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে চীন এক বিশাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তারা তাদের উৎপাদন খাতকে আরও উচ্চপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে ধাবিত করছে। এর ফলে চীনের শ্রমঘন এবং প্রথাগত উৎপাদন ব্যবস্থার একটি বড় অংশ স্বাভাবিকভাবেই নতুন, নির্ভরযোগ্য এবং প্রতিযোগিতামূলক গন্তব্যের সন্ধান করছে। বাংলাদেশ তাদের জন্য সেই আদেশ ও সম্ভাবনাময় গন্তব্য হতে পারে। আমাদের দেশের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার এবং ভৌগোলিক অবস্থান বিদেশি বিনিয়োগের জন্য চমৎকার পরিবেশ তৈরি করেছে।
প্রধানমন্ত্রী চীনা কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের চমৎকার পরিবেশ সম্পর্কে আশ্বস্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রতিটি উদ্বেগ ও প্রত্যাশাকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিমধ্যে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে। মোংলায় দ্বিতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। এই বিশেষ অঞ্চলগুলোতে উন্নত লজিস্টিকস সুবিধা থাকবে। সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা হবে। সেখানে নিরবচ্ছিন্ন ইউটিলিটি তথা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সেবা নিশ্চিত করা হবে।
দক্ষ শ্রমশক্তি ও শক্তিশালী সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক সেখানে গড়ে তোলা হবে। তবে এই সফরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘোষণাটি ছিল আমাদের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, খুব সুনির্দিষ্ট এবং আধুনিক লাইসেন্স অনুমোদন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তুতি চলছে। এর ফলে নতুন কোনো বিদেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মাত্র ১৫ দিনেরও কম সময়ে বাংলাদেশে তাদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করতে পারবে। আমাদের দেশে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ বা ব্যবসায়িক পরিবেশের দীর্ঘসূত্রতা দীর্ঘদিনের একটি বড় রোগ। এই ১৫ দিনের প্রতিশ্রুতি যদি আমাদের আমলারা বাস্তবে রূপ দিতে পারেন, তবে তা বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক জোয়ার নিয়ে আসবে। কেবল বিশেষ সম্পর্ক ডেস্ক বা ওয়েবসাইট খুলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বেশিদিন ধরে রাখা যায় না। মাঠপর্যায়ে সেবার গতি বাড়ানোই আসল চ্যালেঞ্জ।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের জন্য পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং নদীর নাব্যতা রক্ষা করা একটি জীবন-মরণ সমস্যা। বেইজিং সফরে চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোওইংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই বৈঠকে তিস্তাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রধান নদীর অববাহিকা ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে দেশের চলমান নদী খনন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন। তিনি বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ এবং সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে চীন সরকারের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। বিশেষ করে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীনের কারিগরি ও ধারাবাহিক সম্পৃক্ততার আগ্রহ আমাদের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেই প্রতিশ্রুতির আলোকে চীন এখন এই মহাপরিকল্পনার পরিকল্পনা পর্যায় থেকে শুরু করে কারিগরি সহায়তা পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে যুক্ত হতে চায়।
বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং বড় নদী ব্যবস্থাপনায় চীন সরকারের দীর্ঘদিনের বিশ্বমানের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তারা তাদের দেশে বহু বিশাল ও জটিল প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, তিস্তার মতো একটি স্পর্শকাতর আন্তর্জাতিক নদীর অববাহিকা ব্যবস্থাপনা কেবল কোনো সাধারণ কারিগরি বা প্রকৌশলগত বিষয় নয়। এর সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চীনকে এই বিশাল প্রকল্পে যুক্ত করার ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের আগ্রহকে সাধুবাদ জানাতে হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে ঢাকাকে বিচক্ষণ, দূরদর্শী ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির পরিচয় দিতে হবে। নদীর তলদেশ খনন, পানি ধরে রাখার জলাধার নির্মাণ এবং নৌ-নেভিগেশনের উন্নয়ন যেন দ্রুত শুরু করা যায়, সে জন্য যৌথ বিশেষজ্ঞ দলের কাজকে অবিলম্বে গতিশীল করতে হবে। এই প্রকল্প যেন কোনো রাজনৈতিক টানাপোড়েনে থমকে না যায়, তা নিশ্চিত করাই হবে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা।
এবারের চীন সফরে স্বাক্ষরিত ১৩টি সমঝোতা স্মারকের পরিধি এবং গভীরতার দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। দুই দেশের সম্পর্ক এখন কেবল বড় অবকাঠামো নির্মাণ বা ঋণের বৃত্তে সীমাবদ্ধ নেই। এই সম্পর্ক এখন অনেক বেশি বহুমাত্রিক ও টেকসই রূপ নিচ্ছে। গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ বা জিডিআই-এর অধীনে দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হয়েছে। এর আওতায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়ন সম্পর্কিত বিষয়গুলো রয়েছে। বিশেষ করে টেকনিক্যাল এবং ভোকেশনাল শিক্ষার ক্ষেত্রে সহযোগিতায় দুটি পৃথক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এটি বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। চীন তাদের উন্নত কারিগরি শিক্ষার অভিজ্ঞতা আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নেবে। এর ফলে আমাদের দেশের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আধুনিকায়নের সুযোগ পাবে। মানবসম্পদ উন্নয়নে পৃথক কো-অপারেশন প্ল্যানও সই হয়েছে, যা সরকারি কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।
অর্থনৈতিক কূটনীতিতে আরেকটি চমকপ্রদ অর্জন এসেছে কৃষি খাতে। বাংলাদেশ থেকে আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠাল রপ্তানির বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। চীন এক বিশাল বাজার। সেখানে বাংলাদেশের ফলমূল ও কৃষিপণ্যের প্রবেশাধিকার আমাদের অর্থনীতিতে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করবে। এটি আমাদের কৃষিপণ্যের রপ্তানি ঝুড়ি বৈচিত্র্যায়নে ব্যাপক সাহায্য করবে। এর পাশাপাশি গণমাধ্যম খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে চারটি পৃথক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, তথ্য আদান-প্রদান বৃদ্ধি এবং দুই দেশের গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এই চুক্তিগুলো করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে সঠিক তথ্যের আদান-প্রদান দুই দেশের জনগণের মধ্যে বোঝাপড়া ও বন্ধুত্বকে আরও গভীর করবে।
তবে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, এই তথ্য আদান-প্রদান যেন কেবল একমুখী না হয়। বাংলাদেশের গণমাধ্যম যেন তার নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য, বস্তুনিষ্ঠতা এবং স্বাধীনতা বজায় রেখে বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের পূর্ণ সুবিধা নিতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ ও নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল ও অসহনীয় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শরণার্থী শিবিরগুলো আমাদের পরিবেশ ও স্থানীয় জনমিতির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই মানবিক ও নিরাপত্তা সংকটটি জোরালোভাবে চীনের প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেছেন। এই বিষয়ে চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তাদের সম্পূর্ণ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। চীন আশ্বস্ত করেছে, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে তারা সব সময় বাংলাদেশের পাশে থাকবে। আমরা সবাই জানি, মিয়ানমারের বর্তমান জান্তা সরকারের ওপর চীনের গভীর ও কার্যকর প্রভাব রয়েছে। চীন যদি আন্তরিকভাবে এবং সক্রিয়ভাবে মধ্যস্থতা করে, তবেই রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন সম্ভব। বেইজিংয়ের এই আশ্বাসের পর ঢাকাকে এখন বেইজিংয়ের ওপর সার্বক্ষণিক কূটনৈতিক চাপ ও লবিং বজায় রাখতে হবে। এই আশ্বাস যেন কেবল দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কাগজি বিবৃতিতে আটকে না থাকে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
এর পাশাপাশি রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই সফরে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে তিনি তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় উষ্ণ অভিনন্দন জানান। তিনি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক ৯ বার চীন সফরের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি একটি চমৎকার তথ্য জানান যে, ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার চীন সফরের ঐতিহাসিক ছবিগুলো তাঁর সম্মানে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় জাদুঘরে যত্নসহকারে সংরক্ষিত রয়েছে।
লিউ হাইশিং বিএনপি এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে অতীতে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের কথা উল্লেখ করেন। তিনি দুই দলের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা আরও জোরদার করার তীব্র আগ্রহ প্রকাশ করেন। বিশেষ করে গবেষক, তরুণ সমাজ, গণমাধ্যম এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে ভবিষ্যতে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। এই রাজনৈতিক আলোচনা প্রমাণ করে , বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক কোনো সাময়িক বা তাৎক্ষণিক ঘটনা নয়। এটি গভীর ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত এক সুদৃঢ় বন্ধন।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিবিড় হলেও তা চরমভাবে ভারসাম্যহীন এবং একপাক্ষিক। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি আমাদের জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ও দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ। চীন বাংলাদেশকে পণ্য আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, কঠোর কোয়ারেন্টাইন নিয়ম এবং মান নিয়ন্ত্রণের কারণে আমরা তার পূর্ণ সুবিধা নিতে পারছি না।
এবারের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়ে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। চীন বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি পণ্য আমদানির আশ্বাস দিয়েছে। তবে কেবল আশ্বাসের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। আমাদের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পণ্যের মান আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। চীনের বাজারে কোন কোন পণ্যের চাহিদা বেশি, তা নিয়ে আমাদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে সুনির্দিষ্ট গবেষণা করতে হবে। অপ্রচলিত পণ্য যেমন চামড়া, পাটজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য রপ্তানিতে জোর দিতে হবে। তবেই বাণিজ্য ঘাটতির এই বিশাল পাহাড় ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
তবে বেইজিং সফরের বিপুল সম্ভাবনাকে বাস্তবায়নে রূপ দিতে হলে বাংলাদেশকে সুনির্দিষ্ট, বাস্তবসম্মত এবং সময়োপযোগী কৌশল গ্রহণ করতে হবে। এই লক্ষ্যে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। যেমন–
১. এই সফরে স্বাক্ষরিত ১৩টি সমঝোতা স্মারক এবং তিস্তা প্রকল্পের কারিগরি দিকগুলো সার্বক্ষণিক তদারকি করার জন্য একটি বিশেষ ‘বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতা টাস্কফোর্স’ গঠন করা যেতে পারে। এর ফলে আমলাতান্ত্রিক স্থবিরতা দূর হবে এবং প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি নিশ্চিত হবে।
২. প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ১৫ দিনের মধ্যে লাইসেন্স দেওয়ার প্রতিশ্রুতি যেন কোনোভাবেই লাল ফিতার দূরত্বে বা ফাইলের জটে আটকে না যায়। বিডার প্রশাসনিক কার্যক্ষমতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা আরও অনেক গুণ বাড়াতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যেন কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন।
৩. কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার চুক্তির অধীনে চীনা উন্নত প্রযুক্তি, ল্যাবরেটরি সুবিধা এবং আধুনিক জ্ঞান বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে স্থানান্তরের বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের যুবসমাজকে শুধু সস্তা শ্রমশক্তি হিসেবে নয়, বরং দক্ষ প্রযুক্তিবিদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
৪. বর্তমানের মেরুকরণমুখী বিশ্বে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করার পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রতিবেশী দেশসমূহ এবং বৈশ্বিক অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। এটি বাংলাদেশের নিজস্ব সার্বভৌমত্ব, ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য অপরিহার্য।
পরিশেষে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই চীন সফর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং জাতীয় উন্নয়নের যাত্রাপথে এক নতুন গতির সঞ্চার করেছে। বেইজিং বিশ্বমঞ্চে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, তারা বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নযাত্রায় সমমর্যাদার এক প্রকৃত, দীর্ঘমেয়াদি ও বিশ্বস্ত অংশীদার হতে চায়। এখন বল সম্পূর্ণভাবে ঢাকার কোর্টে। আমাদের জাতীয় প্রশাসনিক দক্ষতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং কৌশলগত দূরদর্শিতাই নির্ধারণ করবে আমরা চীনের এই গভীর আগ্রহ ও বিশাল বিনিয়োগের প্রস্তাবগুলোকে কতটা নিজেদের দেশের অনুকূলে ব্যবহার করতে পারি।
বেইজিংয়ের গ্রেট হলে বাংলাদেশ যে লালগালিচা সংবর্ধনা এবং সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান পেয়েছে, তার প্রকৃত সার্থকতা ও মূল্যায়ন হবে তখনই—যখন বাংলাদেশের মাটিতে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, তিস্তা অববাহিকার দীর্ঘদিনের জলসংকট দূর হবে, বাণিজ্য ঘাটতি কমবে এবং বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থেই এশিয়ার পরবর্তী অর্থনৈতিক বিস্ময় হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নিজের নাম খোদাই করতে সক্ষম হবে।
আহমেদ তোফায়েল
বিজনেস এডিটর, প্রতিদিনের বাংলাদেশ