• হোম > Following > লক্ষ্মীপুরে এক বাসায় ৪ খুন, পরিবারে একমাত্র বেঁচে রইল সিফাত

লক্ষ্মীপুরে এক বাসায় ৪ খুন, পরিবারে একমাত্র বেঁচে রইল সিফাত

  • শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ২৩:০২
  • ৬৩

লক্ষ্মীপুরে এক বাসায় ৪ খুন, পরিবারে একমাত্র বেঁচে রইল সিফাত

মাত্র ১৮ বছর বয়সেই পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন জুনায়েদ ইসলাম সিফাত। একাদশ শ্রেণির এই শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে মা ও তিন বোনের সংসারের হাল ধরেছিলেন। ১২ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর মা শাহিনুর বেগমের সংগ্রাম আর চার সন্তানের স্বপ্নই ছিল পরিবারের একমাত্র ভরসা। কিন্তু বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে মা ও তিন বোনকে হারিয়ে পৃথিবীতে একেবারেই একা হয়ে গেলেন সিফাত।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার দেনায়েতপুর এলাকায় ডাকাতিয়া নদীর তীরের একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন শাহিনুর বেগম ও তাঁর সন্তানরা। দুপুরে পুলিশ বাসা থেকে শাহিনুর বেগম, বড় মেয়ে সায়মা আক্তার ও ছোট মেয়ে শিফা আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করে। গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা মেজো মেয়ে ইকরা আক্তারকে ঢাকায় নেওয়ার পথে তারও মৃত্যু হয়।

ঘটনার পর স্থানীয়রা বাসা ঘেরাও করে সন্দেহভাজন অন্তর মজুমদারকে আটক করেন। পরে উত্তেজিত জনতার গণপিটুনিতে তার মৃত্যু হয়। নোয়াখালীর সুবর্ণচরের বাসিন্দা অন্তর রায়পুরে ফল বিক্রি করতেন এবং কয়েক মাস আগেও একই ভবনের একটি ইউনিটে ভাড়াটিয়া ছিলেন। শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত তার মরদেহ নিতে পরিবারের কেউ হাসপাতালে আসেননি।

শুক্রবার লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে চারজনের ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ সিফাতের চাচা মো. জামাল উদ্দিনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। স্থানীয়দের উদ্যোগে রায়পুরে প্রথম জানাজা শেষে মরদেহ কুমিল্লার হোমনা উপজেলার নিজ গ্রামে দাফনের জন্য নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

সিফাতের চাচা জানান, প্রায় ২০ বছর আগে জীবিকার সন্ধানে তাঁর ভাই কামাল উদ্দিন কুমিল্লার হোমনা ছেড়ে রায়পুরে বসবাস শুরু করেন। হাঁড়ি-পাতিল ও ক্রোকারিজ সামগ্রী ফেরি করে সংসার চালাতেন তিনি। ২০১৯ সালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তাঁর মৃত্যু হলে চার সন্তানকে নিয়ে নতুন করে সংগ্রাম শুরু করেন শাহিনুর বেগম।

ঘটনার দিন সকাল সাতটার দিকে প্রতিদিনের মতো কর্মস্থলে যান সিফাত। সকাল ১১টার দিকে এক প্রতিবেশীর ফোন পেয়ে বাসায় ফিরে রান্নাঘরে মায়ের রক্তাক্ত মরদেহ এবং ঘরের বিভিন্ন স্থানে তিন বোনের নিথর দেহ দেখতে পান। সেই বিভীষিকাময় দৃশ্য দেখে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

প্রতিবেশী ও স্বজনদের ভাষ্য, চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও শাহিনুর বেগম সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি। বড় মেয়ে সায়মা ঢাকার আদমজী কলেজ থেকে একাদশ শ্রেণি পাস করে মেডিকেল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। মেজো মেয়ে ইকরা লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়তেন, ছোট মেয়ে শিফা স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। সিফাতও রায়পুর সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনার পাশাপাশি মাসিক আট হাজার টাকা বেতনে চাকরি করে পরিবারের ব্যয় বহন করতেন।

সিফাতের বন্ধু রনি বলেন, পরিবারটি ছিল অত্যন্ত সংগ্রামী। বাবা মারা যাওয়ার পরও কেউ হাল ছাড়েনি। সিফাত কাজ করেও পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু একদিনেই তাদের সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল।

রায়পুর বাজার বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ জানান, কয়েক মাস আগে সিফাত তাঁর প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েও তিনি লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সমাজের মানুষের সহযোগিতায় কোনোমতে চলছিল পরিবারটি। এমন মর্মান্তিক পরিণতি কেউ কল্পনাও করেননি।

পুলিশ জানিয়েছে, ২০১৯ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর শাহিনুর বেগম চার সন্তানকে নিয়ে ওই বাসায় বসবাস করছিলেন। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, পূর্বপরিচয়ের সূত্রে অন্তর মজুমদার সেদিন সকালে বাসায় প্রবেশ করেন।

প্রথম প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেশী আফরোজা আক্তার রানী জানান, ভবনের মালিক এলাকায় না থাকায় অন্য ভাড়াটিয়াদের ভাড়া শাহিনুর বেগমের কাছেই জমা রাখা হতো। স্থানীয়দের ধারণা, ঘরে টাকা বা স্বর্ণালংকার রয়েছে—এমন ধারণা থেকেই ডাকাতি বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে অন্তর বাসায় প্রবেশ করে থাকতে পারেন।

রানী বলেন, অন্তরকে বাসার ভেতরে দেখে সন্দেহ হলে তিনি কারণ জানতে চান। অন্তর নিজেকে পানির পাইপ মেরামতের কর্মী বলে দাবি করলেও তিনি তা বিশ্বাস করেননি। পরে দ্রুত কলাপসিবল গেট বন্ধ করে স্থানীয়দের খবর দেন, যার ফলে সন্দেহভাজন ব্যক্তি পালাতে পারেননি।

পুলিশের ভাষ্য, ঘটনার পরপরই জনতার হাতে সন্দেহভাজনের মৃত্যু হওয়ায় হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত উদ্দেশ্য উদ্ঘাটন আরও জটিল হয়ে পড়েছে। লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক বলেন, কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তা নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে এবং সব দিক গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. অরূপ পাল জানান, নিহত চারজনের শরীরেই ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন কি না, তা রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/12549 ,   Print Date & Time: Monday, 17 August 2026, 06:32:49 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh