• হোম > বাংলাদেশ > আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে

  • শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬, ১৯:০৭
  • ৫৭

 ---

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির প্রধান শর্ত হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির টেকসই উন্নয়ন। এই ভিত্তি ছাড়া দেশের সামগ্রিক উন্নতি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। পৃথিবীর যে সমস্ত দেশ উন্নতির শিখরে উঠেছে, তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অতি উত্তম। আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ এই বিষয়টির প্রতি অত্যাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি দেশ ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোনো স্বপ্নই পূরণ সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করতেন। তাঁর এই বক্তব্য নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে নানামুখী সমালোচনা হয়েছিল। তবে তিনি সব সমালোচনা উপেক্ষা করে অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান নেন।

মালয়েশিয়ার জনগণ আজ সেই দৃঢ়তার সুফল ভোগ করছে। শুধু মালয়েশিয়া নয়, উন্নত রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রার প্রধান ভিত্তিই হলো টেকসই আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ায়। এটি নাগরিকদের জন্য একটি ভয়হীন কর্মপরিবেশ তৈরি করে। বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ঐতিহাসিক শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর এ দেশের ছাত্র-জনতা নতুন স্বপ্ন দেখেছিল। তারা একটি নিরাপদ, শান্তিময় এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ চেয়েছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে দেশ এক ধরনের মব কালচার ও আইনহীনতার মুখে পড়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিচারালয়, সচিবালয় থেকে শুরু করে শিল্প ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন—সর্বত্রই এক ধরনের অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়। এই পরিস্থিতি জনজীবনকে চরম বিপর্যস্ত করে তোলে। এর ফলে দেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এই পটভূমিতে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দেশের মানুষ শান্তি, নিরাপত্তা ও সুশাসনের প্রত্যাশায় বিএনপিকে ম্যান্ডেট দেয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর অপরাধ দমনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। এর ফলে বিগত তিন মাসে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। তবে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। সাম্প্রতিক কিছু পরিসংখ্যান জনমনে আবারও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। এই তথ্যমতে, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে অপরাধের গ্রাফ ছিল ঊর্ধ্বমুখী। মার্চ ও এপ্রিল—এই দুই মাসেই দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। একই সময়ে ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। এই দুই মাসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১২৯টি। একই সময়ে চুরির ঘটনা রেকর্ড হয়েছে ২ হাজার ২১৪টি। পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ৪৯৬টি। এর মধ্যে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

অনুরূপ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সিভিল রাইটস সোসাইটি (বিসিআরএস)। তাদের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে দেশে ১ হাজার ১৪২টি খুন হয়েছে। এই সময়ে ৩৪৭টি অপহরণ, ১৮৪টি ছিনতাই এবং ৫৯১টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এই চার মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে ৫ হাজার ৯৯৮টি। এই পরিসংখ্যানগুলো প্রমাণ করে যে, সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কিছু প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা রয়ে গেছে। পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের রেখে যাওয়া দুর্বলতা থেকে এখনো পুরোপুরি বের হওয়া সম্ভব হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সিভিল প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে এখনো অনেকে বহাল আছেন। এই কর্মকর্তাদের অনেকেই বর্তমান সরকারের নীতি ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে আন্তরিক নন। পাশাপাশি বিচার বিভাগের সংস্কারের গতিও বেশ ধীর। সুপ্রিম কোর্ট ও দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট। গত ২৩ জুনের একটি ঘটনা এর বড় প্রমাণ। ওই দিন আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে কর্মরত ১৮ জন আইন কর্মকর্তা একযোগে পদত্যাগ করেন। তাদের মধ্যে ৭ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবং ১১ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলছে।

দেশের অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে হলে সবার আগে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের কোনো বিকল্প নেই। অতীতে যারা শিল্প-কারখানায় অগ্নিসংযোগ করেছে, তাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। যারা চাঁদাবাজি করেছে কিংবা সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়েছে, তাদের বিচার হতেই হবে। এই ক্ষেত্রে অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা চলবে না। গত ২৩ জুন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সামনে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার সুনির্দিষ্ট বিচার হওয়া প্রয়োজন। জনগণের বিপুল সমর্থনে এই সরকার গঠিত হয়েছে। তাই সরকারের কোনো অপরাধী বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। অপরাধীর একমাত্র পরিচয় সে অপরাধী। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি ছাড়া দেশের কোনো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/12520 ,   Print Date & Time: Monday, 17 August 2026, 09:21:08 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh