![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশের ইলেকট্রনিকস ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম শিল্প গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও বড় সরকারি প্রকল্পগুলোতে এখনও দেশীয় নির্মাতারা কাঙ্ক্ষিত সুযোগ পাচ্ছেন না। খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা বলছেন, পুরোনো সরকারি ক্রয়নীতি, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ভারী বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের জন্য সুনির্দিষ্ট সার্টিফিকেশন কাঠামোর অভাবে তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
শিল্প প্রতিনিধিদের মতে, এই পরিস্থিতি নতুন বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে, প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং দেশের আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়িয়ে তুলছে। ফলে স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ইলেকট্রনিকস ও বৈদ্যুতিক পণ্যের বাজারের আকার ৬০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। গত এক দশকে এ খাতে বিনিয়োগ ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তবুও সরকারি প্রকল্পে বাণিজ্যিক মানের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এইচভিএসি), শিল্প চিলার, ভিআরএফ সিস্টেম এবং লিফট সরবরাহে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কাঙ্ক্ষিত সুযোগ পাচ্ছে না।
পুরোনো ক্রয়নীতির কারণে বৈষম্যের অভিযোগ
সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) ২০০৮-এর আওতায় ব্যবহৃত ‘শিডিউল অব রেটস’ অনুযায়ী বিভিন্ন ব্র্যান্ডকে তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার চেয়ে প্রতিষ্ঠানের বয়স, আন্তর্জাতিক অবস্থান এবং পূর্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়।
এই ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলো ‘ক্যাটাগরি-এ’ তালিকায় থাকলেও অধিকাংশ বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান ‘ক্যাটাগরি-সি’ বা ‘ডি’ শ্রেণিতে অবস্থান করছে। ফলে উচ্চমূল্যের সরকারি প্রকল্পে দেশীয় পণ্যের অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে যাচ্ছে।
ভিশন ইলেকট্রনিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আর এন পাল বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্যিক এসি ও লিফট উৎপাদনে সক্ষম। কিন্তু সরকারি শ্রেণিবিন্যাসের কারণে তারা বড় প্রকল্পে অংশ নিতে পারছেন না।
তিনি বলেন, “সরকারি রেট শিডিউলে আমরা পিছিয়ে থাকায় শুধু সরকারি প্রকল্প নয়, বেসরকারি ডেভেলপাররাও আমাদের মূল্যায়নে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন। এর প্রভাব রপ্তানি বাজারেও পড়ছে।”
স্থানীয় সক্ষমতা থাকলেও আমদানির ওপর নির্ভরতা
খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমানে ওয়ালটন, ভিশন, প্রাণ-আরএফএলসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান উন্নতমানের এইচভিএসি, ভিআরএফ ও শিল্প চিলার সিস্টেম উৎপাদন করছে। তবুও সরকারি হাসপাতাল, অবকাঠামো ও বড় প্রকল্পে বিদেশি ব্র্যান্ডের আধিপত্য বজায় রয়েছে।
সম্প্রতি আটটি বিভাগীয় বিশেষায়িত হাসপাতালের জন্য কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সরবরাহে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
ওয়ালটন গ্রুপের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর তানভীর আহমেদ বলেন, পণ্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্র্যান্ডের ইতিহাস নয়, প্রযুক্তিগত মানদণ্ডকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
তার ভাষায়, “সরকার চাইলে দেশি পণ্যের আন্তর্জাতিক মান যাচাই করতে পারে। আমরা মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হলে সরকারি প্রকল্পে অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়া উচিত।”
লিফট শিল্পেও একই সংকট
দেশীয় লিফট নির্মাতারাও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি। বর্তমান নীতিমালায় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকে উচ্চ পর্যায়ের সরবরাহকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হলেও স্থানীয় উৎপাদকরা নিম্ন শ্রেণিতে রয়ে গেছে।
আর্নেস্ট ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুনুর রশিদ বলেন, বাংলাদেশি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত টিইউভি সুদ সনদ অর্জন করেছে। কিন্তু বর্তমান ক্রয়নীতির কারণে সরকারি প্রকল্পে সেই সক্ষমতার যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না।
শিল্প নেতাদের মতে, দেশীয় কোম্পানিগুলোর উচ্চগতির লিফট উৎপাদন ও স্থাপনের সক্ষমতা থাকলেও বিদ্যমান বিধিমালার কারণে তারা অনেক বড় প্রকল্পে অংশ নিতে পারছে না।
কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা
খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, দেশে বছরে ৮ থেকে ১০ হাজার লিফটের চাহিদা রয়েছে। এছাড়া এয়ার কন্ডিশনার খাতে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে এবং বছরে ৬ থেকে ৭ লাখ ইউনিটের বাজার তৈরি হয়েছে।
গৃহস্থালি এসির প্রায় ৯০ শতাংশ চাহিদা বর্তমানে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পূরণ করছে। তবে উন্নত ভিআরএফ ও চিলার বাজারে তাদের অংশগ্রহণ এখনও প্রায় ১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি প্রকল্পে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে নতুন করে প্রায় ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
নীতিমালা সংস্কারের দাবি
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ এম মাশরুর রিয়াজ বলেন, দেশের ইলেকট্রনিকস ও প্রযুক্তি খাত এখন অন্যতম সম্ভাবনাময় শিল্পে পরিণত হয়েছে। এই শিল্পের বিকাশ ধরে রাখতে নীতিগত সহায়তা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক দেশ সরকারি ক্রয়ে স্থানীয় শিল্পকে অগ্রাধিকার দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের বিদ্যমান কাঠামো দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশি ব্র্যান্ডের তুলনায় কম প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রাখছে।
এদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের (পিডব্লিউডি) কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে বর্তমান নীতিমালা সময়োপযোগী নয়। পিডব্লিউডির প্রকিউরমেন্ট ইউনিটের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আশিক আহমেদ শিবলী জানিয়েছেন, বিদ্যমান কাঠামো ২০১১ সালের বাস্তবতার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল এবং এখন তা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি বলেন, “ক্রয়নীতি সংশোধনের কাজ চলছে। স্থানীয় নির্মাতারা যদি আন্তর্জাতিক মান পূরণ করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে সরকারি প্রকল্পে তাদের আরও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারি ক্রয়নীতির আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় দেশের বিপুল বিনিয়োগ ও উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমানো কঠিন হয়ে পড়বে।