![]()
বাংলাদেশের ২৩ বিলিয়ন ডলারের টেক্সটাইল শিল্প এখন গভীর সংকটে পড়েছে। শিল্প মালিকদের আশঙ্কা, জ্বালানি সংকট, গ্যাসের উচ্চ মূল্য, ব্যাংক ঋণের বাড়তি সুদ, নীতিগত পরিবর্তন এবং আমদানিনির্ভর প্রতিযোগিতার চাপে দেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি খাতটি ধীরে ধীরে ভারত ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে বাজার হারাচ্ছে। ইতোমধ্যে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং অনেক মিল উৎপাদন সক্ষমতার অনেক নিচে পরিচালিত হচ্ছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক বাজেটে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে, যা দেশীয় টেক্সটাইল খাতের জন্য বড় ধাক্কা। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) নেতারা বলছেন, এতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অপব্যবহার আরও বাড়বে এবং স্থানীয় সুতা ও কাপড় উৎপাদকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বেন।
একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০২৩ সালে শিল্প খাতে গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ করা হয় এবং পরে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য আরও বাড়ানো হয়। কিন্তু উচ্চমূল্য পরিশোধ করেও অনেক কারখানা পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না। ফলে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের মতো ব্যয়বহুল জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিটিএমএর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের পর থেকে ২৩৪টি টেক্সটাইল কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
অন্যদিকে, উচ্চ সুদের হারও শিল্প খাতকে চাপে ফেলেছে। বর্তমানে অনেক কারখানাকে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে অনেক উদ্যোক্তা ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছেন এবং নতুন কার্যকরী মূলধন সংগ্রহে সমস্যায় পড়ছেন। ব্যাংকারদের মতে, এই পরিস্থিতিতে বহু কারখানা টিকে থাকার লড়াই করছে।
শিল্প মালিকদের আরেকটি বড় অভিযোগ হলো শুল্কমুক্ত সুতা আমদানির ক্ষেত্রে অনুমোদিত অপচয় (ওয়েস্টেজ) হার ১৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩২ শতাংশ করা। তাদের দাবি, প্রকৃত অপচয়ের তুলনায় এই হার অনেক বেশি। এর সুযোগে অতিরিক্ত সুতা ও কাপড় দেশে এনে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে, যা দেশীয় স্পিনিং ও টেক্সটাইল মিলগুলোর ব্যবসাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বিটিএমএ নেতারা আরও বলেন, ভারত সরকার বিভিন্ন ভর্তুকি ও কর-সুবিধা দেওয়ায় ভারতীয় সুতা বাংলাদেশের বাজারে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে দেশীয় উৎপাদকরা লোকসানে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ ভারতীয় সুতার সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজারে পরিণত হয়েছে বলে দাবি করেছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, টেক্সটাইল খাতের এই সংকট অব্যাহত থাকলে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের স্থানীয় মূল্য সংযোজন আরও কমে যাবে এবং দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প দুর্বল হয়ে পড়বে। বর্তমানে বিটিএমএর আওতাধীন ১,৭৮০টি মিলের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত, যার প্রায় ৬০ শতাংশই নারী। তাই শিল্প খাতের প্রতিনিধিরা নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, নীতিগত সহায়তা এবং দেশীয় উৎপাদকদের জন্য সমতাভিত্তিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।