• হোম > এন্টারপ্রেনার > যেভাবে ট্রিলিয়নেয়ার হলেন ইলন মাস্ক

যেভাবে ট্রিলিয়নেয়ার হলেন ইলন মাস্ক

  • বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১১:৩৯
  • ১১২

যেভাবে ট্রিলিয়নেয়ার হলেন ইলন মাস্ক

এক সংখ্যার পর ১২টি শূন্য বসালে এক ট্রিলিয়ন হয়। বাংলায় একে বলা চলে এক লাখ কোটি। ২০২৬ সালের জুনে বিশ্ব অর্থনীতি এক নতুন ইতিহাসের সাক্ষী হলো। বিশ্বের প্রথম ‘ট্রিলিয়নেয়ার’ বা এক লাখ কোটি ডলারের একক মালিক হলেন ইলন মাস্ক। তিনি গুগল, আমাজন বা ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতাদের অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছেন। মাস্কের এই উত্থান কেবল একজন ব্যক্তির সম্পদ বৃদ্ধির গল্প নয়। এটি বর্তমান বিশ্বের প্রযুক্তি, পুঁজিবাদ ও ক্ষমতার এক নতুন সমীকরণ। প্রশ্ন হলো, দক্ষিণ আফ্রিকার এক সাধারণ বালক কীভাবে এই চূড়ান্তে পৌঁছালেন? এই বিপুল ক্ষমতা পৃথিবীর জন্য কী বার্তা বয়ে আনছে?

প্রতিকূলতা ডিঙানো এক ‘আলফা’র মনস্তত্ত্ব:

ইলন মাস্কের সাম্রাজ্য বুঝতে হলে তাঁর অতীতে তাকাতে হবে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় তাঁর শৈশব কেটেছে। তাঁর বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়েছিল। স্কুলে তিনি নিয়মিত বুলিং বা হয়রানির শিকার হতেন। পাশাপাশি তাঁর অ্যাসপারগার সিনড্রোম ছিল। এর ফলে মানুষের সামাজিক সংকেত বুঝতে তাঁর কষ্ট হতো। কিন্তু এই প্রতিবন্ধকতাই তাঁর ভেতরে এক অদম্য জেদ তৈরি করে। শৈশবেই তিনি ভাইয়ের সঙ্গে বাড়ি বাড়ি গিয়ে চকলেট বিক্রি করতেন। মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি নিজের প্রথম কম্পিউটার গেম তৈরি করেন।

পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি অর্থনীতি ও পদার্থবিদ্যায় পড়াশোনা করেন। মাস্কের চরিত্রের সবচেয়ে বড় দিক হলো তাঁর চরম প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব। তাঁর প্রথম স্ত্রী জাস্টিন মাস্কের মতে, ধনী হওয়ার আগেই মাস্ক ছিলেন ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ। তিনি “না” শব্দটিকে কখনও মেনে নিতেন না। এমনকি বিয়ের নাচের সময়ও মাস্ক স্ত্রীকে বলেছিলেন, “এই সম্পর্কে আমিই আলফা।” এই আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষাই তাঁকে ব্যবসায় সফল করেছে। তবে এটি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকে বেশ বিতর্কিত ও অস্থির করে তুলেছে।

যেভাবে গড়ে উঠল ট্রিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্য:

নব্বইয়ের দশকে মাস্ক দুটি প্রযুক্তি স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠা করেন। এর মধ্যে একটি ছিল অনলাইন ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান। এটি পরে ‘পেপ্যাল’ নামে পরিচিত হয়। ২০০২ সালে পেপ্যাল ১.৫ বিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়ে যায়। মাস্ক সেই পুরো অর্থ নতুন ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। মহাকাশ গবেষণার জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘স্পেসএক্স’। একই সঙ্গে তিনি অর্থ বিনিয়োগ করেন বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘টেসলা’তে।

শুরুর দিকে এই দুই কোম্পানিই দেউলিয়া হওয়ার কাছাকাছি পৌঁছেছিল। কিন্তু মাস্কের দূরদর্শিতা ও ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা কোম্পানি দুটিকে বাঁচিয়ে দেয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে তিনি প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মালিক হন। আর ২০২৬ সালের জুনে স্পেসএক্স পাবলিক বা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এর পরেই মাস্কের নিট সম্পদ বিলিয়ন থেকে ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। ব্লুমবার্গের হিসাবে বর্তমানে তাঁর সম্পদের পরিমাণ ১.১১ ট্রিলিয়ন ডলার। টেসলা থেকে তাঁর বিশেষ পারিশ্রমিক প্যাকেজ এবং স্টারলিংকের ব্যবসাই তাঁকে এই অবস্থানে এনেছে।

ইলন মাস্কের সম্পদ বৃদ্ধির সাথে সাথে তাঁর সামাজিক প্রভাবও বেড়েছে। ২০২২ সালে তিনি ৪৪ বিলিয়ন ডলারে টুইটার (বর্তমান এক্স) কেনেন। তবে ভুল সিদ্ধান্তের কারণে এখন কোম্পানিটির মূল্য কমে ৯.৪ বিলিয়নে নেমেছে। অনেক বড় প্রতিষ্ঠান এই প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে গেছে। অভিযোগ আছে, মাস্কের নেতৃত্বে এক্স-এ ঘৃণামূলক বক্তব্য অনেক বেড়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়েও মাস্কের দ্বিমুখী অবস্থান স্পষ্ট। তিনি ওপেনএআই-এর প্রাথমিক বিনিয়োগকারী ছিলেন। পরে তিনি এর প্রধান স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করেন। বর্তমানে তিনি নিজের ‘এক্সএআই’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। মাস্কের ১৪ জন সন্তান রয়েছে। তিনি মনে করেন, জন্মহার হ্রাস ও এআই-এর অগ্রগতি মানুষের সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে। তাই তিনি জনসংখ্যা সংকট মোকাবিলায় অবদান রাখছেন। তবে সম্প্রতি তাঁরই এআই টুল ব্যবহার করে ডিপফেক তৈরির অভিযোগে মামলা হয়েছে। এটি প্রযুক্তির এক অন্ধকার দিক উন্মোচন করে।

রাজনীতির আঙিনায় ইলন

মাস্ক দীর্ঘদিন নিজেকে রাজনৈতিকভাবে মধ্যপন্থী দাবি করে এসেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি পুরোপুরি ডানপন্থী রাজনীতির দিকে ঝুঁকেছেন। ২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জেতাতে তিনি বড় ভূমিকা রাখেন। ট্রাম্পের জয়ের পর তিনি ‘ডিপার্টমেন্ট অফ গভর্নমেন্ট ইমার্জেন্সি’র দায়িত্ব পান। এই দায়িত্বে এসে তিনি সরকারি ব্যয়ে ব্যাপক কাটছাঁট করেন। এটি বিশ্বজুড়ে বড় বিতর্কের জন্ম দেয়। পরে অবশ্য কর ও ব্যয়সংক্রান্ত বিরোধের জেরে তিনি হোয়াইট হাউস ছাড়েন। একইভাবে তিনি যুক্তরাজ্যের লেবার সরকারেরও তীব্র সমালোচনা করেছেন। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, মাস্ক এখন কেবল একজন ব্যবসায়ী নন। তিনি একজন বড় ভূ-রাজনীতির প্রভাবক।

তবে ইলন মাস্কের ট্রিলিয়নেয়ার হওয়া একটি বড় বার্তা দেয়। বর্তমান বিশ্বে রাষ্ট্রগুলোর চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠছে করপোরেট ব্যক্তিরা। মাস্ক দাবি করেন তিনি মানবতার স্বার্থে কাজ করেন।

লেখক: আহমেদ তোফায়েল

বিজনেস এডিটর, প্রতিদিনের বাংলাদেশ


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/12405 ,   Print Date & Time: Saturday, 26 September 2026, 08:37:16 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh