• হোম > অর্থনীতি > আমানতে সংগহে পিছিয়ে পড়ছে ইসলামী ব্যাংকগুলো

আমানতে সংগহে পিছিয়ে পড়ছে ইসলামী ব্যাংকগুলো

  • মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ১৭:৪৮
  • ৭২

 ---

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

হাইলাইটস

• এক বছরে  প্রচলিত ব্যাংকগুলোর আমানত প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২.৭৩ শতাংশ, ইসলামী ব্যাংকগুলোর প্রবৃদ্ধি মাত্র ৮.৯৮ শতাংশ।

• প্রচলিত ব্যাংকগুলোর আমানত বেড়ে ১৫ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা থেকে ১৭ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সময়ে ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত বেড়েছে ৪ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা থেকে ৪ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকায়

• ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর ইসলামী ব্যাংকিং খাতে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা গ্রাহকদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

• ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন, তারল্য সংকট ও পরিচালন দুর্বলতার কারণে আমানতকারীদের একটি অংশ প্রচলিত ব্যাংকের দিকে ঝুঁকেছেন

আহমেদ তোফায়েল

দেশের ব্যাংক খাতে গত এক বছরে আমানত, বিনিয়োগ ও সম্পদ বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সমানভাবে পায়নি ইসলামী ব্যাংকগুলো। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর ইসলামী ব্যাংকিং খাতে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা গ্রাহকদের আস্থায় প্রভাব ফেলেছে, যার সুযোগে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহে এগিয়ে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর আমানত বেড়ে ১৫ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা থেকে ১৭ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এ সময়ে তাদের আমানত প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

অন্যদিকে, একই সময়ে ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত বেড়েছে ৪ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা থেকে ৪ লাখ ৮১ হাজার কোটি টাকায়। ফলে এ খাতে আমানত প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৯৮ শতাংশে, যা প্রচলিত ব্যাংকগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহের পর ইসলামী ব্যাংকিং খাতে সৃষ্ট অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে আমানতকারীদের একটি অংশ প্রচলিত ব্যাংকের দিকে ঝুঁকেছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তারল্য সহায়তা, ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে প্রশাসক নিয়োগসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব উদ্যোগ ভবিষ্যতে গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের প্রায় ৮৭ দশমিক ২১ শতাংশই মুদারাবাভিত্তিক। এছাড়া মোট আমানতের প্রায় ৯০ দশমিক ২ শতাংশ এসেছে বেসরকারি খাত থেকে।

সম্পদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও প্রচলিত ব্যাংকগুলো এগিয়ে রয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিলের মধ্যে এসব ব্যাংকের মোট সম্পদ ৩২ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩৭ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা ১৪ দশমিক ৭২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সমান।

অন্যদিকে, ইসলামী ব্যাংকগুলোর সম্পদ বেড়েছে ৯ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা থেকে ৯ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকায়। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

তবে বিনিয়োগ কার্যক্রমে ইসলামী ব্যাংকগুলো পুরোপুরি স্থবির হয়নি। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে তাদের বিনিয়োগ বেড়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা থেকে ৫ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকায়, যা ৬ দশমিক ২৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি । একই সময়ে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ৭১ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, মুনাফা ও লোকসান ভাগাভাগিভিত্তিক অর্থায়ন পণ্যের চাহিদা বাড়ায় ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগে ধীর হলেও ধারাবাহিক সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে। শিল্প, বাণিজ্য ও ব্যবসা খাতেই এসব বিনিয়োগের বড় অংশ যাচ্ছে, যা উৎপাদন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ইসলামী ব্যাংকগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার চলমান সংস্কার উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে আস্থা ধীরে ধীরে ফিরতে পারে। তবে সেই আস্থা পুনর্গঠনের জন্য সুশাসন, স্বচ্ছতা ও শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত, বিনিয়োগ ও সম্পদ বৃদ্ধির হার প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনীতিবিদরাও এ প্রবণতার পেছনে আস্থার সংকট ও সুশাসনের ঘাটতিকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংকিং খাতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়, সেটিই আমানত প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার মূল কারণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাতটির কয়েকটি ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন, তারল্য সংকট এবং পরিচালন দুর্বলতার কারণে আমানতকারীদের একাংশ প্রচলিত ব্যাংকের দিকে ঝুঁকেছেন। ফলে প্রচলিত ব্যাংকগুলোতে আমানত বৃদ্ধির হার বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেওয়া পদক্ষেপ—যেমন তারল্য সহায়তা দেওয়া, ব্যাংকগুলোর দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে প্রশাসক নিয়োগ—দীর্ঘমেয়াদে গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে।

এ ছাড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের প্রায় ৮৭ শতাংশই মুদারাবাভিত্তিক। অর্থাৎ, এ খাতে আমানতের উৎস তুলনামূলকভাবে সীমিত ও নির্দিষ্ট ধরনের পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে প্রায় ৯০ শতাংশ আমানত বেসরকারি খাতনির্ভর হওয়ায় গ্রাহকদের আস্থায় সামান্য পরিবর্তনও আমানত প্রবাহে বড় প্রভাব ফেলে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকিং খাতে আমানত বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় নিয়ামক হলো আস্থা। কোনো ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন বা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে গ্রাহকরা দ্রুত নিরাপদ বিকল্প খুঁজতে শুরু করেন। তাদের মতে, ইসলামী ব্যাংকিং খাতে সাম্প্রতিক সময়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা কেবল স্বল্পমেয়াদি তারল্য সংকটের বিষয় নয়; বরং এটি সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থনীতিবিদরা আরও মনে করেন, ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ ও সম্পদ বৃদ্ধির হার ইতিবাচক থাকলেও প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে কয়েকটি বিষয়ে জোর দিতে হবে—পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা; ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা; শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে জবাবদিহি বাড়ানো; আমানতকারীদের সঙ্গে নিয়মিত ও কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি আরও শক্তিশালী করা।

তাদের মতে, ইসলামী ব্যাংকিং পণ্যের চাহিদা এখনো রয়েছে এবং মুনাফা-লোকসান ভাগাভাগিভিত্তিক অর্থায়নের সম্ভাবনাও যথেষ্ট। ফলে আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠতে পারলে এই খাত আবারও উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে পারে।

সার্বিকভাবে, আমানত প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার মূল কারণ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক যেখানে জুলাই-পরবর্তী অস্থিরতা ও আস্থার পরিবর্তনের কথা বলছে, সেখানে অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘমেয়াদে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর তদারকির ঘাটতিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/12281 ,   Print Date & Time: Saturday, 10 October 2026, 03:22:53 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh