• হোম > দেশজুড়ে > পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পে বদলে যাবে ২৪ জেলার দৃশ্যপট, কৃষি ও কর্মসংস্থানে নতুন সম্ভাবনা

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পে বদলে যাবে ২৪ জেলার দৃশ্যপট, কৃষি ও কর্মসংস্থানে নতুন সম্ভাবনা

  • শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ১৩:১৬
  • ৬৪

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পে বদলে যাবে ২৪ জেলার দৃশ্যপট, কৃষি ও কর্মসংস্থানে নতুন সম্ভাবনা

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের উন্নয়নের স্বপ্নযাত্রায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সম্পূর্ণ দেশীয় অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এই মেগা প্রকল্পটি কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা, নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের ২৪টি জেলার ১৬১টি উপজেলার প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে।

পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেছেন, পদ্মা ব্যারাজ শুধু একটি নদীকেন্দ্রিক প্রকল্প নয়; এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। দীর্ঘদিনের নাব্যতা সংকট, শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব এবং সীমিত পানি ব্যবস্থাপনার কারণে এ অঞ্চলের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, নদীভাঙন রোধ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পরিবর্তন আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রায় দুই লাখ হেক্টরের বেশি এক ফসলি জমি দুই ফসলি জমিতে এবং এক লাখ হেক্টরের বেশি জমি তিন ফসলি জমিতে রূপান্তরিত হতে পারে। এর ফলে সাগরের লবণাক্ততার প্রভাব কমে কৃষিজমিতে মিঠা পানির সরবরাহ নিশ্চিত হবে, যা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করবে। কৃষি গবেষকদের ধারণা, উন্নত সেচব্যবস্থা চালু হলে বোরো ধানের উৎপাদন প্রতি হেক্টরে ৪.৫-৫ টন থেকে বেড়ে ৬-৭ টনে উন্নীত হতে পারে। একইভাবে গম, ভুট্টা ও আলুর উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের সংসদ সদস্য ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেছেন, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এখন আর স্বপ্ন নয়, এটি বাস্তবতার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি জানান, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই প্রকল্পের অপেক্ষায় ছিল এবং এটি বাস্তবায়িত হলে কৃষি, যোগাযোগ ও জীবনমান উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা নদীর বাংলাদেশ অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৪১ কিলোমিটার। প্রতি বছর নদীভাঙনের কারণে কয়েকশ হেক্টর কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয় এবং হাজার হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গত দুই দশকে পদ্মা তীরবর্তী এলাকায় প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রকল্পের আওতায় নিয়মিত ড্রেজিং, নদীর তীর সংরক্ষণ এবং আধুনিক পানি প্রবাহ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে নদীভাঙনের হার ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

বন্যা নিয়ন্ত্রণেও প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ, নিয়ন্ত্রিত প্রবাহ এবং দ্রুত নিষ্কাশন ব্যবস্থার মাধ্যমে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হতে পারে। এতে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পাবে এবং কৃষিজমি, বসতভিটা, সড়ক, সেতু ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রক্ষা করা সম্ভব হবে।

অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন বিশ্লেষকদের মতে, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, গুদামজাতকরণ এবং বিপণন খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে। কৃষকের আয় গড়ে ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। পাশাপাশি কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে এক থেকে দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প শুধু একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মসূচি নয়; এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ, কৃষি আধুনিকায়ন এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলে দেশের কৃষি ও অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/11968 ,   Print Date & Time: Friday, 9 October 2026, 05:12:45 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh