• হোম > অর্থনীতি > বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ

বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ

  • শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬, ১৭:৫১
  • ৭৮

---

ই-বাংলাদেশ ডেস্ক

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের চার মাস পেরিয়ে গেছে। এই স্বল্প সময়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি বেশ কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁর এই ইতিবাচক পদক্ষেপগুলো সর্বমহলে সমাদৃত হয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের মনে এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই ভালো চেষ্টাগুলো মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন হতে দিচ্ছে না কে বা কারা?

গত মঙ্গলবার বিএনপি বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রধানমন্ত্রী নিজেই তাঁর অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক দর্শনের কথা স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, আমাদের প্রতিহিংসার মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। আসুন আমরা নিজের চিন্তা কিছুটা বদলানোর চেষ্টা করি। অতীতে আমার সঙ্গে যা হয়েছে, এখন প্রতিশোধ নিলে তা ফেরত পাওয়া যাবে না। তাই প্রতিশোধের মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এর বদলে দেশের জন্য আমরা কী করতে পারি, সেই চেষ্টা করা উচিত। প্রধানমন্ত্রীর এই উদার ও দূরদর্শী আকাঙ্ক্ষা সত্ত্বেও মাঠের বাস্তবতা এখনো ভিন্ন।

প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও মব সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা এখনো চলছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, মে মাসেই মব হামলায় অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছেন। এই সংখ্যা গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে এপ্রিল মাসেও এই সংখ্যা ছিল ২১। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছে বর্তমান সরকার। কিন্তু মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা হচ্ছে। উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর নতুন মামলায় পুনরায় গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে। এই পুরোনো সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি জনমনে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এমনকি অতি সম্প্রতি জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় নাঈম হাসানকে পুলিশ হেনস্তা করেছে। এই ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

বেসরকারি খাতের ক্ষতি ও বিনিয়োগের পরিবেশ:
বিগত দেড় বছরের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে দেশের বেসরকারি খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে এসেছিল। কলকারখানায় মব হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল। ঢালাওভাবে ব্যবসায়ীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছিল। ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ করে ব্যবসায়ীদের সামাজিক হেনস্তা করা হয়েছিল। এর ফলে উদ্যোক্তাদের মনোবল পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী নিজে একজন শিল্প-উদ্যোক্তা। তিনি বন্ধ কারখানা চালুর জন্য নতুন বাজেটে আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। কিন্তু কেবল অর্থ সাহায্যই যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন একটি নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ। দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের আশ্বাস দিয়েছিলেন। তিনি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের কথা বলেছিলেন। কিন্তু গত চার মাসেও তার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ ও বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা
অন্তর্বর্তীকালীন আমলে বহু ব্যবসায়ীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বেআইনিভাবে জব্দ করা হয়েছিল। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকার জনগণের নির্বাচিত সরকার। অথচ এই বেআইনি নিষেধাজ্ঞাগুলো এখনো পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়নি। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরছে না। এটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ডকেই দুর্বল করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা।

বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা নিজেই এখন আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। তাঁদের মতে, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া প্রশাসনিক কাঠামো দিয়ে বর্তমান সরকারের পক্ষে সফল হওয়া কঠিন। মাঠপর্যায়ের আমলাতন্ত্র এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে এখনো বড় ধরনের রদবদল করা সম্ভব হয়নি। সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের আমলে নিয়োগ পাওয়া সিংহভাগ আইন কর্মকর্তা ও বিচারক এখনো বহাল তবিয়তে আছেন। বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত কূটনীতিকরাও স্বপদে বহাল আছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক দর্শনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে কাজ না করার অভিযোগ উঠছে।
পাশাপাশি, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চাটুকারদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। কিন্তু সরকারের চারপাশে আবার নতুন করে তেলবাজির প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন হচ্ছে না। কে কত বড় দলীয় কর্মী বা নেতা ছিলেন, তা প্রমাণের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে আমলাতন্ত্রে। এমনকি ওয়ান-ইলেভেনের সময় যারা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ভূমিকা রেখেছিল, তারাও এখন নব্য রূপ ধারণ করেছে। তারা নতুন করে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।

বর্তমান সরকারের প্রাথমিক স্বস্তির সময় বা ‘হানিমুন পিরিয়ড’ শেষ হয়ে এসেছে। একটি ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। তারা শান্তি, বৈষম্যহীন ও সমতার বাংলাদেশের প্রত্যাশায় ভোট দিয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষ আর কোনো হিংসা, সহিংসতা ও অরাজকতা দেখতে চায় না। প্রধানমন্ত্রীর ৩১ দফা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে। এ জন্য চাটুকার বা তথাকথিত দলীয় এজেন্ডাধারীদের বাদ দিতে হবে। যোগ্য, মেধাবী ও দেশপ্রেমিকদের প্রশাসনে নিয়ে আসতে হবে। একইসাথে প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা বিগত সরকারের অদৃশ্য বাধা ও অপছায়া দ্রুত দূর করতে হবে। কথা ও কাজের মিল না থাকলে জনগণের মনে দ্রুতই অনাস্থা তৈরি হতে পারে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/11897 ,   Print Date & Time: Thursday, 8 October 2026, 08:32:28 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh