![]()
ই-বাংলাদেশ ডেস্ক
বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার প্রযুক্তি খাতে নতুন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে। এআইভিত্তিক ডিভাইস, ডেটা সেন্টার এবং স্মার্ট প্রযুক্তির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মেমোরি চিপ ও সেমিকন্ডাক্টর বাজারে দেখা দিয়েছে ব্যাপক চাপ। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে যাচ্ছে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের পণ্যের ওপর।
প্রযুক্তি বাজারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অ্যাপলের বিদায়ী প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) টিম কুক। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, মেমোরি চিপের বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য প্রায় অসহনীয় হয়ে উঠেছে। ফলে অ্যাপলের বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ানো এখন অনেকটাই অনিবার্য হয়ে পড়েছে।
যদিও তিনি নির্দিষ্ট করে বলেননি ঠিক কোন পণ্যের দাম বাড়বে কিংবা কখন থেকে এই পরিবর্তন কার্যকর হবে, তবে প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী সেপ্টেম্বরে বাজারে আসতে যাওয়া বহুল প্রতীক্ষিত iPhone 18-এর মূল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে AI প্রযুক্তির প্রসার স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, সার্ভার এবং ডেটা সেন্টারের জন্য উন্নত মেমোরি চিপের চাহিদা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক গতিতে না বাড়ায় বাজারে চিপ সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। ফলে RAM, DRAM এবং NAND Flash-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ মেমোরি প্রযুক্তির দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
টিম কুক বলেন, “গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির চাপ যেন না পড়ে, সে জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। কিন্তু মেমোরি চিপ উৎপাদনকারীরা যে হারে দাম বাড়িয়েছে, তা এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে ডিভাইসের চাহিদা অত্যন্ত বেশি। কিন্তু একই সময়ে চিপের সরবরাহ কমে যাওয়ায় পুরো প্রযুক্তি শিল্প বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আমরা আশা করছি, খুব দ্রুত বাজার স্থিতিশীল হবে এবং চিপের মূল্য ও সরবরাহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।”
বাজার বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরের পর থেকে কম্পিউটারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান RAM-এর দাম দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, AI শিল্পের বিস্ফোরণমূলক সম্প্রসারণের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে।
বিশেষ করে ইরান অঞ্চলে চলমান সংঘাতের কারণে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ হিলিয়াম গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এই গ্যাস চিপ উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় চিপ নির্মাতারা বাধ্য হয়ে দাম বৃদ্ধি করছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওমডিয়া (Omdia)-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোনের গড় বিক্রয় মূল্য প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির স্মার্টফোন বাজার বিশ্লেষক চিউ লে জুয়ান জানিয়েছেন, iPhone 18-এ নতুন প্রজন্মের AI ফিচার, উন্নত প্রসেসর এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মেমোরি প্রযুক্তি যুক্ত করা হবে। এর ফলে নতুন মডেলের দাম iPhone 17-এর তুলনায় অন্তত ১৫০ ডলার পর্যন্ত বেশি হতে পারে।
প্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি সাময়িক কোনো মূল্যবৃদ্ধি নয়। বরং AI যুগে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে স্মার্টফোন, ল্যাপটপ এবং অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের উৎপাদন ব্যয় স্থায়ীভাবে বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে প্রযুক্তিপ্রেমী এবং সাধারণ ভোক্তাদের ভবিষ্যতে নতুন ডিভাইস কিনতে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হতে পারে।
উল্লেখ্য, টানা ১৫ বছর অ্যাপলের নেতৃত্ব দেওয়ার পর আগামী সেপ্টেম্বরে সিইও পদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন টিম কুক। তার স্থলাভিষিক্ত হবেন বর্তমান হার্ডওয়্যার প্রধান জন টার্নাস। প্রযুক্তি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই নেতৃত্ব পরিবর্তনের মুহূর্তে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে টিম কুকের এই সতর্ক বার্তা বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।