• হোম > অর্থনীতি > সিটি গ্রুপকে রক্ষা: ২৬,৬০০ কোটি টাকা ঋণ পুনর্গঠনের উদ্যোগ ৩৬ ব্যাংকের

সিটি গ্রুপকে রক্ষা: ২৬,৬০০ কোটি টাকা ঋণ পুনর্গঠনের উদ্যোগ ৩৬ ব্যাংকের

  • বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ১৭:০৪
  • ৯০

সিটি গ্রুপকে রক্ষা: ২৬,৬০০ কোটি টাকা ঋণ পুনর্গঠনের উদ্যোগ ৩৬ ব্যাংকের

দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপকে সচল রাখা এবং এর ২৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে দুটি বিদেশি ব্যাংকসহ মোট ৩৬টি ব্যাংক। শিল্পগোষ্ঠীটি বর্তমানে তীব্র আর্থিক সংকটের মুখে থাকায় ব্যাংকগুলো একটি সিন্ডিকেটেড পুনর্গঠন কাঠামো তৈরির কথা বিবেচনা করছে। এর লক্ষ্য হলো প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালু রাখা এবং ব্যাংকগুলোর ওপর অতিরিক্ত প্রভিশনিংয়ের চাপ কমানো। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য ব্যাংকগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, সিটি গ্রুপের ঋণগুলো আপাতত খেলাপি হিসেবে শ্রেণীকরণ না করে পুনর্গঠন করা হবে এবং পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো হবে। অর্থের ব্যবহার, বিক্রি ও নগদ প্রবাহে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিদের গ্রুপটির পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে একটি কেন্দ্রীয় এসক্রো অ্যাকাউন্ট গঠন করা হবে, যেখানে কোম্পানির সব বিক্রয় আয় জমা হবে। পরে নির্ধারিত সূত্রে সেই অর্থের একটি অংশ ব্যবসা পরিচালনার জন্য এবং বাকি অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করা হবে।

ব্যাংকারদের মতে, এটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত ‘ওয়াটারফল মেকানিজম’ অনুসরণে পরিচালিত হবে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো পণ্য বিক্রি থেকে ১০০ টাকা আয় হলে প্রথমে তা এসক্রো অ্যাকাউন্টে জমা হবে। এরপর প্রায় ৮০ টাকা ব্যবসার চলতি মূলধন হিসেবে ফেরত দেওয়া হবে এবং অবশিষ্ট ২০ টাকা ঋণ পরিশোধের জন্য সংরক্ষণ করা হবে। এভাবে নগদ প্রবাহের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ রেখে প্রতিষ্ঠানটির পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হবে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)-এর চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিনের উদ্যোগে এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানও এ ধরনের সমাধানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে ব্যাংকগুলোর চূড়ান্ত ঐকমত্য এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনের ওপর পুরো পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে।

পুনর্গঠন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একটি স্বাধীন মনিটরিং কমিটি গঠন এবং বাইরের বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি সিটি গ্রুপের নন-কোর বা মূল ব্যবসার বাইরে থাকা সম্পদ বিক্রি করে নগদ অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে। গ্রুপটির অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাই-টেক পার্কসহ কিছু বড় প্রকল্প বিক্রির মাধ্যমে দায় কমানোর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সিটি গ্রুপের বর্তমান আর্থিক সংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ফজলুর রহমানের মৃত্যুর পর ব্যবস্থাপনায় একক নেতৃত্বের অভাব দেখা দেয়। একই সময়ে ব্যাংকিং খাতের সংকট, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে অস্থিরতা এবং চলতি মূলধনের ঘাটতি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। গ্রুপটির দাবি, ২০২২ সাল থেকে তারা বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারের কারণে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে।

সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান জানিয়েছেন, টাকার অবমূল্যায়ন ও ব্যাংকগুলোর ঋণসীমা সংকুচিত হওয়ার ফলে তাদের আমদানি সক্ষমতা প্রায় ৯০ কোটি ডলার কমে গেছে। আগে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ব্যাংকিং সুবিধা থাকলেও ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে সেই সুবিধার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এছাড়া কয়েকটি স্থানীয় ব্যাংকের জারি করা এলসি বিদেশি সরবরাহকারীরা গ্রহণ না করায় কাঁচামাল আমদানিও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

সংকট আরও গভীর হয়েছে মুন্সীগঞ্জে সিটি গ্রুপের ছয়টি শিল্প প্রকল্পে গ্যাস সংযোগ না পাওয়ার কারণে। প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ সম্পন্ন হলেও প্রকল্পগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি। গ্রুপটির দাবি, এসব প্রকল্প বন্ধ থাকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। একই সঙ্গে নীতিগত পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন কর সুবিধা প্রত্যাহার হওয়াও তাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

সিটি গ্রুপের মতে, শুধু ঋণ পুনর্গঠন করলেই সংকটের সমাধান হবে না। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সচল রাখতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত চলতি মূলধন, ব্যাংকিং সহায়তা এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ। তারা মনে করছে, বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো যদি ব্যাপক আর্থিক সংকটে পড়ে, তাহলে তার প্রভাব শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দেশের ব্যাংকিং খাত, বৈদেশিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/11878 ,   Print Date & Time: Thursday, 8 October 2026, 12:54:39 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh