![]()
দেশের ব্যাংক খাত ২০২৫ সালে নজিরবিহীন আর্থিক সংকটে পড়েছে। কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের বিপুল লোকসানের কারণে পুরো ব্যাংকিং খাত বছরের শেষে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা নিট লোকসানে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ব্যাংক খাতের নিট মুনাফা ছিল ১৪ হাজার ২৩ কোটি টাকা, যা ২০২৩ সালে বেড়ে ১৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। তবে ২০২৪ সালে তা কমে ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকায় নেমে আসে এবং ২০২৫ সালে পরিস্থিতি বড় ধরনের নেতিবাচক মোড় নেয়।
ব্যাংক খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক নয়টি ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান যাচাই (অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ-একিউআর) পরিচালনা করে। আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করা এই মূল্যায়নে কয়েকটি ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক দুর্বলতা সামনে আসে। বর্তমানে এসব ব্যাংকের মধ্যে পাঁচটি একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর ১০টি ব্যাংক সম্মিলিতভাবে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা লোকসান করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬৬ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা লোকসান করেছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের লোকসান ৩১ হাজার কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংকের ২৮ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা এবং ইউনিয়ন ব্যাংকের ৪ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। এছাড়া জনতা ব্যাংক, এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংকও লোকসানে রয়েছে।
অন্যদিকে কয়েকটি ব্যাংক উল্লেখযোগ্য মুনাফা অর্জন করেছে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে শীর্ষে রয়েছে। দেশীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংক ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা এবং পূবালী ব্যাংক ১ হাজার ৯০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। তবে এসব মুনাফা দুর্বল ব্যাংকগুলোর বিশাল লোকসানের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতের ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের বিষয়টিও উদ্বেগজনকভাবে উঠে এসেছে। দেশের মোট ঋণের প্রায় ৫৯ শতাংশ বর্তমানে ‘দুর্দশাগ্রস্ত’ বা ডিস্ট্রেসড ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যার পরিমাণ ১০ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা পুনঃতফসিল করা ঋণ, আর বাকি অংশ খেলাপি, অবলোপনকৃত এবং আদালতের আদেশে স্থগিত থাকা ঋণ। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আন্তর্জাতিকভাবে ডিস্ট্রেসড ঋণের নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই এবং পুনঃতফসিলকৃত ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ হলে সেগুলোকে ডিস্ট্রেসড ঋণ হিসেবে গণ্য করা হয় না।
সামগ্রিকভাবে, ব্যাংক খাতের এই চিত্র দেশের আর্থিক ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ আদায় এবং সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে খাতটির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।