• হোম > Business > স্থবির আবাসন খাত: অর্ধেকে নেমেছে ফ্ল্যাট বিক্রি

স্থবির আবাসন খাত: অর্ধেকে নেমেছে ফ্ল্যাট বিক্রি

  • মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ১৭:৪৪
  • ১১৫

স্থবির আবাসন খাত: অর্ধেকে নেমেছে ফ্ল্যাট বিক্রি

দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে প্রায় ১৫ শতাংশ অবদান রাখা আবাসন খাতের ওপর বর্তমানে বড় ধরনের মন্দার কালো ছায়া নেমে এসেছে। খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদদের মতে, আবাসন কেবল একক কোনো খাত নয়, এটি দেশের অর্থনীতির একটি প্রধান ‘রিয়েল সেক্টর’ বা প্রকৃত উৎপাদনশীল খাত। একটি ফ্ল্যাট বা বাড়ি নির্মাণের পেছনে যে বিপুল বিনিয়োগ হয়, তা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রড, সিমেন্ট, টাইলস ও সিরামিকসহ অন্তত ২৬৯টি সহযোগী বা লিংকেজ শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত। ফলে আবাসন খাতের বর্তমান সংকট পুরো সামষ্টিক অর্থনীতিকেই এক বড় ধরনের কাঠামোগত ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, চলমান অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং নীতিগত অস্থিরতার কারণে আবাসন খাতে গ্রাহকদের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে বাজারে ফ্ল্যাট বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে, যা শতাংশের হিসাবে ৭০ ভাগ পর্যন্ত । আগে যেখানে প্রতি মাসে গড়ে ১ হাজারটি ফ্ল্যাট বিক্রি হতো, বর্তমানে তা ৫০০-তে এসে ঠেকেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বাজার। এই বিক্রির খরা তৈরির পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে নির্মাণ সামগ্রীর লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি। রড, সিমেন্ট, ইট, বালু ও পাথরের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় আবাসন প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এর সাথে যুক্ত হয়েছে ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, যা পূর্বের ৯-১০ শতাংশ থেকে লাফিয়ে এখন ১৫-১৬ শতাংশে পৌঁছেছে। পাশাপাশি এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে আবাসন খাতের নিবন্ধন ব্যয় সর্বোচ্চ ১৩ শতাংশের ওপরে হওয়ায় সাধারণ ক্রেতারা আগ্রহ হারাচ্ছেন। একই সাথে ফ্লোর এরিয়া রেশিও বা ‘এফএআর’ কমে যাওয়ায় বহুতল ভবন নির্মাণের সুযোগ সীমিত হয়েছে, যা জমির মালিকদেরও নিরুৎসাহিত করছে।

নতুন করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রড উৎপাদন পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট ভ্যাট এবং স্ক্র্যাপের ওপর শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব এই খাতকে আরও কোণঠাসা করে তুলেছে।

অথচ ২ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগের এই আবাসন খাতটি বাংলাদেশের অন্যতম অর্থনৈতিক স্তম্ভ। দেশের প্রায় ১ হাজার ৪০০-র বেশি কোম্পানি এই খাতে সরাসরি যুক্ত থেকে প্রতি বছর সরকারকে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব জোগান দিচ্ছে। একই সাথে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান টিকিয়ে রেখেছে এই শিল্প। কিন্তু বর্তমান মন্দার কারণে নির্মাণ সামগ্রীর পাইকারি বাজার, বিশেষ করে বাংলামোটরসহ বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা এখন পুঁজি হারানোর তীব্র শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে আবাসন খাত জিডিপির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, যেমন চীনে ২৩ থেকে ২৮ শতাংশ এবং উন্নত দেশগুলোতে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশেও এর সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে, যেখানে আবাসন খাতের প্রতি ১ টাকা বিনিয়োগ অর্থনীতিতে আড়াই টাকারও বেশি গতিশীলতা তৈরি করে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিশেষজ্ঞরা কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো রিহ্যাবের প্রস্তাব অনুযায়ী আবাসন নিবন্ধন ব্যয় ১৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা। এছাড়া মধ্যবিত্তের আবাসন নিশ্চিত করতে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণের ব্যবস্থা করা এবং খাতটিকে সচল করতে সাময়িক করমুক্ত সুবিধা বা করনীতিতে নমনীয়তা প্রদর্শন করা প্রয়োজন। এর ফলে আবাসন সচল হলে লিংকেজ শিল্পগুলো থেকেও সরকার আরও বেশি রাজস্ব আদায় করতে পারবে। একই সাথে একটি স্বচ্ছ, পেশাদার ও প্রযুক্তিনির্ভর দীর্ঘমেয়াদি একীভূত পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন, যা প্রকৌশলী, স্থপতি ও দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে। সময়মতো সঠিক সরকারি নীতি সহায়তা ও সুনির্দিষ্ট প্রণোদনা না দিলে আবাসন খাতের এই পতন দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতিতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তাই বাজেট-পরবর্তী চলমান আলোচনায় এই খাতের যৌক্তিক দাবিগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার এখনই উপযুক্ত সময়।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/11725 ,   Print Date & Time: Thursday, 17 September 2026, 10:46:27 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh