![]()
চলতি অর্থবছরের শেষ পর্যায়ে এসেও রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতির মুখে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এক লাখ কোটি টাকারও বেশি কম রাজস্ব আদায় হওয়ায় আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, করজাল সম্প্রসারণের সুযোগ থাকলেও প্রয়োজনীয় সংস্কার ও আধুনিকায়ন ছাড়া এ লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
চলতি অর্থবছরে তিন লাখ কোটি টাকার কিছু বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে, তবে ঘাটতি এখনও এক লাখ কোটি টাকার বেশি। অথচ প্রস্তাবিত ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার বাজেটের প্রায় ৮৭ শতাংশ অর্থই এনবিআরকে সংগ্রহ করতে হবে। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কোনো অর্থবছরেই এনবিআর মূল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ অর্জন করতে পারেনি।
অর্থনীতিবিদ মামুন রশীদ মনে করেন, ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হলে হয় অত্যন্ত কঠোর কর প্রশাসন নিশ্চিত করতে হবে, নয়তো বড় ধরনের সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। তার মতে, কার্যকর সংস্কার করা গেলে লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি অর্জিত না হলেও তার কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব।
অন্যদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-এর গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, কর ফাঁকি ও কর এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা এখনও ব্যাপক। অনেক পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য দিয়ে কর রিটার্ন জমা দেন। তিনি অভিযোগ করেন, এনবিআরের কিছু মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন বাস্তবায়নে অনাগ্রহী।
কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, কর কাঠামো বা নীতিগত পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার না হলে শুধু মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়িয়ে অতিরিক্ত দুই লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হবে। তার মতে, করহার, করনীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় গঠনগত পরিবর্তন জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। দেশে কোটিপতির সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে কর আদায় বাড়ছে না। সাধারণ জনগণ ভ্যাট ও পরোক্ষ করের মাধ্যমে বেশি করের বোঝা বহন করলেও অনেক বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও উচ্চ আয়ের ব্যক্তি প্রকৃত কর পরিশোধের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের অভিমত, এনবিআরকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল, স্বচ্ছ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা না গেলে আগামী অর্থবছরেও রাজস্ব ঘাটতি অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলে সরকারকে ব্যয় মেটাতে আরও বেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত পরোক্ষ করের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপরই অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। তবে করজাল কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং কর প্রশাসনের সংস্কার নিশ্চিত করা গেলে উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।