• হোম > অর্থনীতি > এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাত বিষয়ে উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব সমূহ

এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাত বিষয়ে উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব সমূহ

  • সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১৬:৩৩
  • ৫৭

এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাত বিষয়ে উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব সমূহ

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা খুবই নাজুক। চিকিৎসা ব্যবস্থা এতটাই খারাপ যে সামর্থ্য ও ক্ষমতাবানরা দেশে চিকিৎসা গ্রহণ করেন না বললেই চলে, বিদেশে চিকিৎসা নেন। বাংলাদেশের মানুষ বিদেশে চিকিৎসা নিতে যেয়ে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বা ৬০ হাজার কোটি টাকার অধিক ব্যয় করে বলে ধারণা করা হয়। এদেশে যে গুটি কয়েক ভালো হাসপাতাল আছে সেখানে সবার চিকিৎসা নেয়ার সামর্থ্য নাই। তাই বিএনপি সরকার আগে থেকেই ঘোষণা দিয়েছিল তাদের অগ্রাধিকার খাতের একটি হবে স্বাস্থ্য। বাজেটে স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দেয়াও হয়েছে। সে অনুযায়ী প্রাক্কলিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রেখেছে। এছাড়া ঔষধের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঔষধের অন্যতম উপাদান এপিআই (একটিভ ফার্মাসিটিউক্যালস ইনগ্রিডিয়েন্ট) তৈরীর নতুন কতিপয় কাঁচামাল আমদানীতে শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি ঔষধের রপ্তানী প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে নতুন করে কতিপয় মৌলিক কাঁচামাল অন্তর্ভুক্ত করে আমদানী শুল্ক শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ঔষধ শিল্প সাময়িক সুরক্ষা পাবে। তারচেয়ে বরং এপিআই উৎপাদনে ১৫ বছরের জন্য কর অব্যাহতি দেয়া হলে ঔষধ শিল্প আরও লাভবান হতো, ভবিষ্যতে ট্রিপস ও এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী চ্যালেঞ্জ সমূহ মোকাবেলা করতে সক্ষম হতো। যাইহোক এই বিশাল ঘাটতি বাজেটে প্রত্যাশার বাস্তবায়ন অনেক চ্যালেঞ্জিং হবে। প্রত্যাশার কতুটুকু বাস্তবায়ন সম্ভব হবে সেটা নির্ভর করছে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করার উপরে। স্বাস্থ্য খাতে প্রস্তাবের উল্লেখযোগ্য দিক গুলো নিচে তুলে ধরছি:

১) স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। যা মোট জিডিপির এক দশমিক শূণ্য শতাংশ। গত অর্থ বছরের ( ২০২৫-২০২৬) সংশোধিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির শূণ্য দশমিক ৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ চলতি অর্থ বছরের চেয়ে আগামী অর্থ বছরে প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ৩৪ হাজার কোটি টাকার বেশী, যা প্রায় দ্বিগুণ।

২) বাজেটে হার্টের রিং (স্টেন্ট), কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস চিকিৎসার খরচ কমাতে ভ্যাট ছাড়ের প্রস্তাব সহ একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

৩) বাজেটে মাননীয় অর্থ মন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, নির্বাচনী ইশতেহার মোতাবেক বাংলাদেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় প্রত্যেক নাগরিককে  ন্যাশনাল হেলথ সিস্টেমের আওতায় আধুনিক ‘ই-হেলথ কার্ড’ দেওয়া হবে যা একটি ভালো উদ্যোগ হবে বলে আশা করা যায়।

৪) রোগে আক্রান্তদের সহায়তা দ্বিগুণ করার প্রস্তাব: নতুন অর্থ বছরে ক্যান্সারসহ ছয় রোগে আক্রান্তদের সহায়তা দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ক্যান্সারসহ ছয়টি দুরারোগ্য রোগে আক্রান্তদের এককালীন সহায়তা ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ টাকা করা হবে। বর্তমানে সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের আওতায় ক্যান্সার, কিডনি জটিলতা, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে প্যারালাইজড, জন্মগত হৃদরোগ ও থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্তদের জন্য এককালীন ৫০ হাজার টাকা অর্থ সহায়তার কর্মসূচী চালু রয়েছে।ও

৫) হার্টের রিংয়ে ১০ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি: প্রস্তাবিত বাজেটে হার্টের রিংয়ের জোগানদার পর্যায়ে ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে।এতে প্রতিটি রিংয়ে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ কমতে পারে।এ ছাড়াও কিডনির সমস্যা জনিত রোগীদের ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানীতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ অগ্রিম কর তুলে দেওয়া হয়েছে। এতে ফিল্টারের দাম কমে আসবে। প্রতিটি রোগীর ডায়ালাইসিস বাবদ ৮০০ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে। এছাড়াও কিডনি রোগীদের হেমোডায়ালাইসিসের ব্লাড টিউবিং সেট আমদানীতে সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাটের আগাম কর প্রত্যাহার করা হয়েছে।

৬) ওষুধের কাঁচামাল আমদানীতে শুল্ক ছাড়: ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় ওষুধ তৈরীর নতুন ৯ টি কাচামাল আমদানীতে রেয়াতী সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি একটিভ ফার্মাসিটিউক্যালস ইনগ্রিডিয়েন্ট (এপিআই) তৈরীর নতুন ৫১ টি কাচামাল আমদানীতে শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি ঔষধের রপ্তানী প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে নতুন করে আরো ১৭ টি মৌলিক কাঁচামাল অন্তর্ভুক্ত করে আমদানী শুল্ক শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

৭) পাচ হাজার চিকিৎসক ও এক লাখ স্বাস্থ্য কর্মী নিয়োগ: মান সম্মত ও জনমূখী স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে নতুন করে এক লাখ স্বাস্থ্য কর্মী নিয়োগের কার্যক্রম সরকার শুরু করেছে। তার মধ্যে ৮০ শতাংশ নারী সদস্য হবে। পাশাপাশি দ্রুত ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তার সাথে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি খাতে উচ্চ শিক্ষা ও পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর সূযোগ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। মেডিক্যাল ও ডেন্টাল শিক্ষাকে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহজলভ্য করতে শিক্ষার্থী দের জন্য শিক্ষা ঋণ সুবিধা চালুর ঘোষনা দেওয়া হয়েছে।

[ বিঃ দ্রঃ প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে যা বলা হয়েছে সেটা আপাতত দৃষ্টিতে ভালো হলেও তার বাস্তবায়নের সফলতা আন্তরিকতা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতার উপর  নির্ভর করছে। আর এক্ষেত্রে সময়মতো সিদ্ধান্ত ও অর্থ বরাদ্দ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যা বলা হয়েছে সেটা ওভার নাইট বাস্তবায়ন সম্ভব না। সাধারণ ভাবে বলা হয় স্বাস্থ্যের স্বাস্থ্য ভালো না, এটা দিয়েই অনেক কিছু বোঝা যায়। আমাদের যেমন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রয়েছে, তেমনি মানসিকতাও উদার না। আর স্বাস্থ্যখাত একটি জটিল সমীকরণ দ্বারা সীমাবদ্ধ। যেখানে একজন ডাক্তারের বদলির আদেশ বাস্তবায়ন করা কঠিন (ডাক্তাররা বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নামে বিভক্ত), যেখানে সরকারি হাসপাতাল গুলো দালাল চক্রের হাতে জিম্মি, যেখানে অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালে প্যারাসিটামল ছাড়া ঔষধ পাওয়া যায় না, একটি সাধারণ টেস্টও বাইরে থেকে করাতে হয়, যেখানে পরীক্ষার যন্ত্রপাতি অকেজো করে রাখা হয়, সরকারি এম্বুলেন্স গুলা চলে না, যেখানে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে রোগীর স্বজন আর ইন্টার্ন ডাক্তারদের বচসায় ডাক্তাররা নিয়মিত ধর্মঘট করে, সেখানে স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার আশ্বাস শুনতে ভালো, বাস্তবে কঠিন। জুলাই ২৪ পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের এখন এই কঠিন কাজটি করার সময় এসেছে, কেননা জনগণ তাঁর ন্যায্য অধিকার পেতে চায়।]

মোহাম্মদ ইকবাল জামাল

ব্যবস্থাপনা পরিচালক,

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/11638 ,   Print Date & Time: Monday, 5 October 2026, 03:10:08 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh