![]()
২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ঘিরে তীব্র সমালোচনা করেছেন অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তার মতে, বাজেটটি একটি দুর্বল, অপেশাদার এবং অমনোযোগী আর্থিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে বাস্তবতার সঙ্গে প্রাক্কলনের বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে।
রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টারে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬–২৭: অসুবিধাগ্রস্ত মানুষের জন্য কী আছে?’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তিনি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বর্তমানে তা প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়ে এমন পূর্বাভাস কতটা যৌক্তিক। তার ভাষায়, “ভ্রান্ত ধারণার ওপর ভিত্তি করে প্রাক্কলন করা হলে বাস্তব নীতি কার্যকর হবে না।”
তিনি আরও বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে, মজুরি বৃদ্ধি নিশ্চিত না হলে এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি শক্তিশালী না করা হলে মধ্যবিত্তের ওপর চাপ কমবে না। একই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শর্ত বাস্তবায়নের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন, যা আগামী দিনে সরকারের নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাসের সম্পর্ক নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে তিনি বলেন, শুধু বাণিজ্য বা রফতানি বাড়লেই দারিদ্র্য কমে যাবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। তার মতে, মানুষের প্রকৃত আয় কমছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে জটিল করে তুলছে।
কর কাঠামোর প্রসঙ্গেও তিনি সমালোচনা করেন। নির্দিষ্ট আয়ের সীমার মধ্যে থাকা ব্যক্তিদের ওপর করের চাপ বাড়তে পারে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাজেট ব্যবস্থাপনা ও নীতি বাস্তবায়ন নিয়ে চারটি প্রস্তাবও তুলে ধরেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এর মধ্যে রয়েছে—তথ্যভিত্তিক প্রাক্কলন নিয়মিত হালনাগাদ করা, প্রতি তিন মাস অন্তর সংসদে বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি উপস্থাপন, সংসদীয় ককাস গঠন এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও নীতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’ চালু করা।
তিনি তথ্য উপাত্ত ব্যবহারে স্বচ্ছতার ওপর বিশেষ জোর দেন। তার মতে, বাজেট প্রণয়ন ও উপস্থাপনে তথ্য নিয়ে কোনো ধরনের অস্পষ্টতা বা বিকৃতি ভবিষ্যতে নীতিগত আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা টেনে তিনি সতর্ক করেন যে, ভুল তথ্যভিত্তিক নীতি গ্রহণ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
সব মিলিয়ে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের বক্তব্যে এবারের বাজেটকে ঘিরে বাস্তবতা ও প্রাক্কলনের ব্যবধান, মধ্যবিত্তের চাপ এবং নীতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ ফুটে ওঠে।