• হোম > বাংলাদেশ > মেট্রোরেল না মনোরেল? চট্টগ্রামের জন্য কোনোটিই বাস্তবসম্মত নয়, বলছেন বিশেষজ্ঞরা

মেট্রোরেল না মনোরেল? চট্টগ্রামের জন্য কোনোটিই বাস্তবসম্মত নয়, বলছেন বিশেষজ্ঞরা

  • সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১৩:৩২
  • ৮০

মেট্রোরেল না মনোরেল? চট্টগ্রামের জন্য কোনোটিই বাস্তবসম্মত নয়, বলছেন বিশেষজ্ঞরা

চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যার সমাধানে মেট্রোরেল নাকি মনোরেল—এ বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। তবে পরিবহন বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করেন, বর্তমানে চট্টগ্রামের জন্য এই দুটি ব্যয়বহুল গণপরিবহন প্রকল্পের কোনোটিই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত নয়। তাদের মতে, নগরীর বিদ্যমান ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বাসসেবা ও পথচারী অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে তুলনামূলক কম খরচে অনেক বেশি কার্যকর সমাধান সম্ভব।

এমন সময়েই চট্টগ্রাম মহানগরীর জন্য একটি সমন্বিত পরিবহন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ করছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে মেট্রোরেল, লাইট রেল ট্রানজিট (এলআরটি) এবং মনোরেলের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। এর মধ্যেই মেট্রোরেল বনাম মনোরেল বিতর্ক সামনে এসেছে।

ডিটিসিএর ‘ট্রান্সপোর্ট মাস্টার প্ল্যান অ্যান্ড প্রিলিমিনারি ফিজিবিলিটি স্টাডি ফর আরবান মেট্রোরেল ট্রানজিট কনস্ট্রাকশন অব চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এরিয়া’ প্রকল্পের লক্ষ্য হলো চট্টগ্রামের যানজট নিরসন, গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব নগর পরিবহন কাঠামোর সম্ভাব্যতা মূল্যায়ন। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭০ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, যার বড় অংশ অর্থায়ন করছে দক্ষিণ কোরিয়ার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা কোইকা (কেওআইসিএ)।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম সফর শেষে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক ড. মো. মশিউর রহমান জানান, যাত্রী চাহিদা ও ট্রাফিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত সুপারিশমালা প্রস্তুত করা হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যাত্রীচাহিদা বেশি হলে মেট্রোরেল, মাঝারি হলে এলআরটি এবং কম হলে মনোরেলের বিষয়টি বিবেচনায় থাকবে।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন প্রকাশ্যেই মনোরেল প্রকল্পের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি মনে করেন, বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য এই প্রকল্প চট্টগ্রামের জন্য একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। সিটি করপোরেশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রায় ৫৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ তিনটি রুটে মনোরেল নির্মাণে ব্যয় হতে পারে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হলে চসিকের সরাসরি আর্থিক দায় থাকবে না বলেও দাবি করা হচ্ছে।

তবে ডিটিসিএর প্রকল্প পরিচালক ও ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ার মীর মোহাম্মদ কামরুল হাসান মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে চট্টগ্রামের পরিবহন চাহিদা পূরণে মেট্রোরেলই অধিক উপযোগী। তার মতে, মনোরেলের যাত্রী পরিবহন ক্ষমতা মেট্রোরেলের তুলনায় অনেক কম। ফলে এটি মূল পরিবহন ব্যবস্থার পরিবর্তে সহায়ক বা ফিডার সেবা হিসেবে বেশি কার্যকর হতে পারে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিমও সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং নগরবাসীর প্রকৃত প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাহাড় ও সাগরবেষ্টিত চট্টগ্রামের পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সবচেয়ে কড়া সমালোচনা এসেছে পরিবহন ও নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে।

পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি এবং সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া প্রশ্ন তুলেছেন, যারা রাজধানী ঢাকাতেই দীর্ঘদিনে কার্যকর গণপরিবহন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি, তারা চট্টগ্রামে এসে কীভাবে আরও জটিল ও ব্যয়বহুল প্রকল্প সফল করবেন?

তার মতে, চট্টগ্রামের বর্তমান বাস্তবতায় মেট্রোরেল বা মনোরেল নিয়ে আলোচনা অনেকাংশেই বাস্তবতা বিবর্জিত। বহদ্দারহাট থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত ইতোমধ্যে একাধিক ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে নতুন করে মেট্রোরেলের পিলার, স্টেশন কিংবা করিডর নির্মাণের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে কি না, সেটিও একটি বড় প্রশ্ন।

সুভাষ বড়ুয়ার মতে, যানজট সমস্যার মূল কারণগুলো এখনো সমাধান করা হয়নি। রিকশা, বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, পথচারী ও অনানুষ্ঠানিক পরিবহন ব্যবস্থাকে সমন্বয় না করে কেবল মেগা প্রকল্প নির্মাণ করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তিনি বলেন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, গণপরিবহনের মানোন্নয়ন এবং নগর বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে চট্টগ্রামের ৮০ শতাংশ সমস্যা সমাধান সম্ভব।

একই ধরনের মত দিয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার। তার ভাষ্য, বাস্তবে প্রয়োজন নির্ধারণের আগে প্রকল্পের ধারণা দেওয়া হচ্ছে, পরে সেই ধারণার পক্ষে সমীক্ষা সাজানো হচ্ছে। এতে জনস্বার্থের চেয়ে প্রকল্পকেন্দ্রিক ব্যয় ও অবকাঠামো নির্মাণের প্রবণতা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

তিনি মনে করেন, কর্ণফুলী টানেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। এসব প্রকল্প প্রত্যাশিত ব্যবহারকারী না পাওয়ায় পরিচালন ব্যয় ও ঋণের চাপ জাতীয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি বোঝা তৈরি করেছে। একই ভুল আবার করা হলে ভবিষ্যতে আরও বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার আগে ট্রাফিক শৃঙ্খলা, বাসসেবার আধুনিকীকরণ, ফুটপাত দখলমুক্ত করা, পথচারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং লেনভিত্তিক চলাচল কার্যকর করা প্রয়োজন। এসব মৌলিক সমস্যা সমাধান না করে সরাসরি মেট্রোরেল বা মনোরেলের মতো ব্যয়বহুল প্রকল্পে যাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

তাদের মতে, প্রযুক্তিগতভাবে মেট্রোরেল কিংবা মনোরেল নির্মাণ করা সম্ভব হলেও মূল প্রশ্ন হচ্ছে—এগুলো কি চট্টগ্রামের জন্য অর্থনৈতিকভাবে টেকসই, জনগণের জন্য সাশ্রয়ী এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে? সেই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামের পরিবহন ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/11623 ,   Print Date & Time: Monday, 5 October 2026, 10:07:48 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh