• হোম > অর্থনীতি > রাজস্ব ঘাটতির ঝুঁকি: ২০২৯ সালের মধ্যে সরকারের ঋণ বাড়তে পারে ১২.৩৪ লাখ কোটি টাকা

রাজস্ব ঘাটতির ঝুঁকি: ২০২৯ সালের মধ্যে সরকারের ঋণ বাড়তে পারে ১২.৩৪ লাখ কোটি টাকা

  • রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ০০:৩৭
  • ৭৫

রাজস্ব ঘাটতির ঝুঁকি: ২০২৯ সালের মধ্যে সরকারের ঋণ বাড়তে পারে ১২.৩৪ লাখ কোটি টাকা

রাজস্ব আহরণে ধারাবাহিক ঘাটতিকে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের আশঙ্কা, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী তিন অর্থবছরে সরকারি ঋণ ১২ লাখ কোটি টাকার বেশি বেড়ে ২০২৯ সালের মধ্যে ৩৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত মিডিয়াম টার্ম ম্যাক্রোইকোনমিক পলিসি স্টেটমেন্টে বলা হয়েছে, জিডিপির অনুপাতে সরকারি ঋণ ৩৯ শতাংশের মধ্যে থাকলেও দেশের নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাতের কারণে ঋণের চাপ অর্থনীতির জন্য উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজস্ব ঘাটতির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৯ সালের মধ্যে উন্নয়ন ব্যয় প্রায় ৯৬ হাজার কোটি টাকা কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগও প্রায় ৮৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ঋণ ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি কমাতে সরকার সুকুক বন্ডের পাশাপাশি আগামী অর্থবছর থেকে স্বল্পমেয়াদি ইসলামিক ট্রেজারি বিল চালুর পরিকল্পনা করেছে। এর মাধ্যমে ঋণের গড় মেয়াদ বাড়ানো এবং পুনঃঅর্থায়ন ঝুঁকি হ্রাসের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তবে আর্থিক খাতে বিদ্যমান তারল্য সংকট এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে এ লক্ষ্য অর্জন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এই লক্ষ্যমাত্রাকে “পরাবাস্তব” বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে সিপিডির আরেক সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, এক বছরের মধ্যে এত বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায় অত্যন্ত কঠিন। রাজস্ব সংগ্রহে ঘাটতি হলে ঋণনির্ভরতা আরও বাড়বে এবং তা সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে।

অবশ্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) ব্যাপক সংস্কার আনা হবে। সংস্থাটিকে পুনর্গঠন, দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে দুর্নীতি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি দোকান ও রেস্তোরাঁকে করজালের আওতায় আনার মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর আশা প্রকাশ করেন তিনি।

ফিসক্যাল রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট স্টেটমেন্টে বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে বাজেট লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় গড়ে ১৬ শতাংশ কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। একই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাজেট ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

অর্থ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, রাজস্ব ঘাটতি পূরণে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হতে পারে। এতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি ২০২৯ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভাব্য ৭.৫ শতাংশের পরিবর্তে ৬.৪৫ শতাংশে নেমে আসার ঝুঁকি রয়েছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় করজাল সম্প্রসারণ, কর অব্যাহতির যৌক্তিকীকরণ, কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে অর্থ বিভাগ।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্য অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগ আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে থাকতে পারে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের মূলধন পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ২.৬১ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩.২০ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৯ অর্থবছরে ৪.২৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিভিন্ন ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়া, ঋণের মেয়াদ পূর্ণ হওয়া এবং টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আগামী বছরগুলোতে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে। বিশেষ করে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের বড় অংশ ডলার ও এসডিআরভিত্তিক হওয়ায় বিনিময় হারজনিত ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্য।

সরকারের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৯ অর্থবছরে মোট সরকারি ঋণের ৫৫.৭ শতাংশ আসবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং ৪৪.৩ শতাংশ বৈদেশিক উৎস থেকে। যদিও ঋণের অনুপাত এখনও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্ধারিত নিরাপদ সীমার মধ্যে রয়েছে, তবুও নিম্ন রাজস্ব-জিডিপি অনুপাতের কারণে ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

সরকার জানিয়েছে, বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের নিচে রাখার নীতি অব্যাহত থাকবে। তবে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক ঋণের প্রকৃত ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/11516 ,   Print Date & Time: Friday, 9 October 2026, 10:27:23 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh