![]()
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাব এখন সরাসরি মার্কিন অর্থনীতিতেও অনুভূত হচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর আগে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশের ঘরে। তবে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ও সরবরাহ সংকটের কারণে মে মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ২ শতাংশে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে টানা তিন মাস ধরে অর্থনৈতিক চাপের ফলে মার্কিন ভোক্তাদের আস্থা ও মনোভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠান JPMorgan Chase পূর্বাভাস দিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০২৭ সালের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বাড়তে পারে।
যুদ্ধের উত্তেজনা শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে বৈশ্বিক বাজারে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে বিভিন্ন দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বেড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও এর ব্যতিক্রম নয়। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে থাকায় সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে ব্যয় বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, যা মে মাসে বেড়ে ৪ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে ফেব্রুয়ারিতে এ হার ছিল মাত্র ২ দশমিক ৪ শতাংশের কাছাকাছি। একই সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে দেশটিতে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের গড় মূল্য ৪ দশমিক ১৫ ডলার, যেখানে ফেব্রুয়ারির শেষে তা ছিল ২ দশমিক ৯৮ ডলার। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহনে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় জ্বালানি বাজারে এই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব খাদ্য, পোশাকসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও পড়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় বেড়ে গেছে। যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ না থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে। মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি চাকরির বাজার নিয়েও মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে, আবার কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কাও বাড়ছে। University of Michigan–এর গবেষণা অনুযায়ী, টানা তিন মাসের অর্থনৈতিক চাপের পর মার্কিন ভোক্তা মনোভাব এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
জ্বালানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির কারণে বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরাও চাপে পড়েছেন। বিশেষ করে স্কুল পরিবহন সেবার সঙ্গে যুক্ত বাস পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্বেগে রয়েছে। তাদের মতে, চালক ও সহকারীদের বেতনের পর জ্বালানিই সবচেয়ে বড় ব্যয়, ফলে তেলের দাম বৃদ্ধি সরাসরি তাদের পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সুদের হার কমানোর কোনো উদ্যোগ প্রেসিডেন্ট Donald Trump নাও নিতে পারেন। বরং উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক Federal Reserve সুদের হার বাড়ানোর চাপের মুখে রয়েছে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শিগগিরই তাদের নীতিনির্ধারণী বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
এদিকে, JPMorgan Chase–এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতিতেও উচ্চ সুদের হার দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি সত্ত্বেও অর্থনীতিবিদরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, যুক্তরাষ্ট্র এর আগেও আরও কঠিন মূল্যস্ফীতির সময় পার করেছে। ২০২২ সালে Russian invasion of Ukraine শুরুর পর ২০২৩ সালের এপ্রিলে দেশটির মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশেরও ওপরে পৌঁছেছিল। ফলে বর্তমান সংকট উদ্বেগজনক হলেও তা অতীতের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেনি। তবুও ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট এবং সুদের হার বৃদ্ধির ঝুঁকি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।