• হোম > এক্সক্লুসিভ | বাংলাদেশ > স্মার্টফোনে কিশোর গ্যাং: ভার্চুয়াল আড্ডা থেকে বাস্তব অপরাধে জড়ানোর শঙ্কা

স্মার্টফোনে কিশোর গ্যাং: ভার্চুয়াল আড্ডা থেকে বাস্তব অপরাধে জড়ানোর শঙ্কা

  • বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২০:১১
  • ৭৯

---
স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারে বদলে গেছে কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগের ধরন। একসময় স্কুল, মাঠ কিংবা পাড়া-মহল্লার আড্ডায় সীমাবদ্ধ থাকা সম্পর্কগুলো এখন গড়ে উঠছে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টিকটক ও অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্মকে ঘিরে। তবে প্রযুক্তিনির্ভর এই পরিবর্তনের পাশাপাশি উদ্বেগজনকভাবে সামনে এসেছে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির বিস্তার, যেখানে স্মার্টফোন ও সামাজিক মাধ্যম অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় বছরে দেশে ১ হাজার ১২৬ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর বড় অংশ ধরা পড়ে ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তারা মূলত ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখত এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সমন্বয় করত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিশোর গ্যাংগুলোর সদস্য সংগ্রহ, দল গঠন, প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কোথাও কোথাও গ্যাংয়ের প্রভাব দেখাতে অস্ত্রের ছবি প্রচার করা হচ্ছে, আবার নতুন সদস্য আকৃষ্ট করতেও এসব মাধ্যম ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইনে দ্রুত পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা পাওয়ার প্রবণতা অনেক কিশোরকে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক মনে করেন, দেশে শিশু-কিশোরদের হাতে খুব অল্প বয়সেই অ্যান্ড্রয়েড ফোন ও উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে তারা তুলনামূলক কম বয়সেই এমন এক ডিজিটাল জগতে প্রবেশ করছে, যেখানে পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ বা দিকনির্দেশনার ঘাটতি রয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে কিশোরদের আচরণে নেতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে এবং পরিবার ও সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণ আইন অমান্যের প্রবণতা ও মানসিক বিকাশসংক্রান্ত ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শিশু-কিশোরদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন আইন ও বিধিনিষেধ আরোপ করছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করে আইন পাস করেছে। একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে ফ্রান্সও। এছাড়া স্পেন, ব্রিটেন, নরওয়ে ও চীনে বয়সভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ বা বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

শিক্ষাক্ষেত্রেও স্মার্টফোন ব্যবহারে কড়াকড়ি বাড়ছে। ইউনেস্কোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৭৯টি দেশে স্কুলে স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শ্রেণিকক্ষে একটি নোটিফিকেশনও শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ব্যাহত করতে পারে এবং পড়াশোনায় ফিরে আসতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রযুক্তিকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করাই সমাধান নয়। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা, জরুরি যোগাযোগ এবং ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সে কারণেই অনেক দেশে কিছু শিক্ষামূলক ও প্রয়োজনীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে বিধিনিষেধের বাইরে রাখা হয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নূর মোহাম্মদের মতে, অনেক শিশু-কিশোর মোবাইল ফোন ব্যবহার করে বই পড়ে, নতুন দক্ষতা অর্জন করে কিংবা গঠনমূলক কাজে যুক্ত হয়। তাই তাদের মনস্তত্ত্ব ও বাস্তব চাহিদা বিবেচনায় রেখে ভারসাম্যপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, কিশোরদের সুস্থ সামাজিক জীবনে ফিরিয়ে আনা এবং ডিভাইসনির্ভরতা কমানো এখন সময়ের দাবি। প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। অন্যথায় ডিজিটাল যুগের সুবিধার পাশাপাশি এর নেতিবাচক প্রভাবও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/11345 ,   Print Date & Time: Friday, 11 September 2026, 04:14:05 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh