![]()
দেশের রপ্তানি খাতকে একক পণ্যের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা থেকে বের করে আনতে এবং বাণিজ্যে বহুমুখীকরণ নিশ্চিত করতে ৩ হাজার কোটি টাকার এক নতুন পুনঃঅর্থায়ন স্কিম গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য মূলত তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ‘মার্কেট কনসেনট্রেশন’ ও ‘প্রোডাক্ট কনসেনট্রেশন’ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই ঝুঁকি হ্রাস করে বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্যে ‘রপ্তানি বহুমুখীকরণ খাতে পুনঃঅর্থায়ন স্কিম’ নামের এই বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছে। গত ৭ জুন ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্ট থেকে এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বিশ্ব বাণিজ্যের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে ভারসাম্য আনয়ন এবং রপ্তানি সহায়ক পরিবেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য এই উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি ছিল। বিশেষ করে পাট, চামড়াসহ এমন কিছু খাত রয়েছে, যার শতভাগ কাঁচামাল দেশীয় উৎস থেকেই সংগ্রহ করা সম্ভব। এসব খাতের বিপুল রপ্তানি সম্ভাবনা বা ‘এক্সপোর্ট পটেনশিয়াল’ থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় অর্থায়নের অভাবে তা পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত হতে পারছিল না। এই নতুন তহবিল সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ওই সব সম্ভাবনাময় খাত থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে, যা দেশের সামগ্রিক দারিদ্র্য দূরীকরণেও ভূমিকা রাখবে।
তিন বছর মেয়াদী এই স্কিমের আকার হবে ৩ হাজার কোটি টাকা, যা একটি আবর্তনশীল তহবিল হিসেবে পরিচালিত হবে। তফসিলি ব্যাংকসমূহের উদ্বৃত্ত তারল্য সংগ্রহের মাধ্যমে এই তহবিলের অর্থের সংস্থান করা হবে। এই স্কিমের আওতায় সুবিধা পেতে আগ্রহী ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টের সাথে একটি অংশগ্রহণ চুক্তি সম্পাদন করতে হবে। তহবিল থেকে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো মাত্র ৪ শতাংশ সুদে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা পাবে এবং গ্রাহক পর্যায়ে এই ঋণের সর্বোচ্চ সুদ বা মুনাফার হার হবে ৳ সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ। সম্পূর্ণ ঋণ বিতরণ করতে হবে ক্রমহ্রাসমান বা রিডিউসিং ব্যালেন্স পদ্ধতিতে, যেখানে ঋণ ও মূলধনের ন্যূনতম অনুপাত হবে ৭০:৩০। তবে গ্রাহক ও ব্যাংক সম্পর্কের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ৬ মাসের একটি গ্রেস পিরিয়ড বা রেয়াতকাল পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ‘রপ্তানি নীতি ২০২৪-২৭’ এর ষষ্ঠ অধ্যায়ে উল্লিখিত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত ও বিশেষ উন্নয়নমূলক খাতের শিল্পসমূহ এই ঋণ সুবিধা পাবে। তবে যেসকল শিল্প প্রতিষ্ঠান দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে রপ্তানি পণ্য উৎপাদন করবে, তারা এই তহবিলের আওতায় অগ্রাধিকার পাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, কোনো খেলাপি গ্রাহক এই সুবিধার আওতায় আসবে না এবং আবেদন করার পূর্বে গ্রাহকের হালনাগাদ সিআইবি রিপোর্ট যাচাই করতে হবে। এছাড়া কোনো গ্রাহকের এক্সপোর্ট বিল অপ্রত্যাবাসিত থাকলে বা অতীতে ঋণ অবলোপনের ইতিহাস থাকলে তারা এই সুবিধা পাবেন না। ঋণের স্বচ্ছতা রক্ষায় ব্যাংকগুলো গ্রাহকের কাছ থেকে কোনো ধরনের লুকায়িত খরচ বা হিডেন এক্সপেন্স আদায় করতে পারবে না।
এই তহবিলের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা রেখেছে। ব্যাংকগুলোকে প্রতি ত্রৈমাসিক শেষ হওয়ার পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে তহবিলের হালনাগাদ বিবরণী জমা দিতে হবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেকোনো সময় সরেজমিনে প্রকল্প পরিদর্শন করতে পারবে। যদি কোনো ব্যাংক ভুল তথ্য দিয়ে সুবিধা গ্রহণ করে বা ঋণের অর্থ অপব্যবহারের বিষয়টি প্রমাণিত হয়, তবে নির্ধারিত সুদের চেয়ে আরও ৫ শতাংশ অতিরিক্ত জরিমানাসহ এককালীন অর্থ কেটে নেওয়া হবে। ব্যাংক কোম্পানী আইন, ১৯৯১ (২০২৩ সালে সংশোধিত) এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জনস্বার্থে জারিকৃত এই নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে, যা দেশের রপ্তানি খাতকে বৈচিত্র্যময় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আরও সক্ষম করে তুলবে বলে আশা করা হচ্ছে।