![]()
দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। রপ্তানি আয় কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নতুন শুল্ক আরোপের প্রস্তাবকে সামনে রেখে আসন্ন বাজেটে কর-সুবিধা ও নীতিগত সহায়তার দাবি জোরালোভাবে তুলছেন উদ্যোক্তারা।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মে মাসে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৫৯ কোটি ৪১ লাখ ডলার। এর মধ্যে নিটওয়্যার খাত থেকে এসেছে ১৯৬ কোটি ৯৩ লাখ ডলার এবং ওভেন পোশাক থেকে ১৬২ কোটি ৪৮ লাখ ডলার। যদিও এপ্রিলের তুলনায় রপ্তানি ১৪ শতাংশের বেশি বেড়েছে, তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় তা প্রায় ৮ শতাংশ কম।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে মোট পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩৫ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ কম। এ অবস্থায় শিল্পমালিকরা খাতটির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে কর কাঠামো পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত নতুন শুল্ক ব্যবস্থা। শ্রমমান সংক্রান্ত উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশসহ প্রায় ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বাংলাদেশের পোশাক খাতের অন্যতম বড় বাজারে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
Bangladesh Knitwear Manufacturers and Exporters Association-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আসন্ন বাজেটে উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করার এবং তা অন্তত পাঁচ বছরের জন্য স্থায়ীভাবে নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নগদ সহায়তার ওপর কর ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি।
ব্যবসায়ীদের আরেকটি উদ্বেগের জায়গা হলো সরকারের উচ্চ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা। তাদের আশঙ্কা, রাজস্ব সংগ্রহের চাপ বাড়লে রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো অতিরিক্ত কর প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার যদি ব্যাংক খাত থেকে বেশি ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হতে পারে, যা শিল্প বিনিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
অর্থনীতিবিদ মাশরুর রিয়াজ মনে করেন, রপ্তানি আয়ের ওপর উৎসে কর আরোপ করনীতির মৌলিক নীতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তার মতে, কর আরোপ হওয়া উচিত প্রকৃত আয় বা মুনাফার ওপর, মোট রপ্তানি মূল্যের ওপর নয়। তিনি বলেন, রাজস্বের ওপর সরাসরি কর আরোপ ব্যবসার কার্যকর কর-ভার বাড়িয়ে দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত লাভের তুলনায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে উৎসে করের পরিবর্তে লাভভিত্তিক কর ব্যবস্থা কার্যকর করা এবং কর সমন্বয় (Tax Credit) প্রক্রিয়া সহজ করা প্রয়োজন। এতে ব্যবসার ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমবে এবং কর ব্যবস্থাও আরও স্বচ্ছ হবে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্য সংকট, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। ফলে শুধুমাত্র কর-সুবিধা বা সরকারি প্রণোদনার ওপর নির্ভর না করে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি ব্যবহার, শ্রম দক্ষতা উন্নয়ন এবং পণ্যের বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে, আসন্ন বাজেটে তৈরি পোশাক খাতের জন্য কর-সহায়তা, সহজ অর্থায়ন এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ কতটা প্রতিফলিত হয়, সেটিই এখন শিল্পমালিক ও বিনিয়োগকারীদের প্রধান প্রত্যাশা।