• হোম > আইন বিভাগ | বাংলাদেশ | বিচার বিভাগ > ‘একজন সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতেও ধর্ষণের শাস্তি সম্ভব’: রামিসা হত্যা রায়ের পর্যালোচনায় যা বললেন আদালত

‘একজন সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতেও ধর্ষণের শাস্তি সম্ভব’: রামিসা হত্যা রায়ের পর্যালোচনায় যা বললেন আদালত

  • রবিবার, ৭ জুন ২০২৬, ১৫:৫৩
  • ৮৯

‘একজন সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতেও ধর্ষণের শাস্তি সম্ভব’: রামিসা হত্যা রায়ের পর্যালোচনায় যা বললেন আদালত

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার আলোচিত মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা (৩০) এবং তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে (২৬) মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল আজ রোববার (৭ জুন) এই রায় ঘোষণা করেন।

রায়ের নথিতে বলা হয়েছে, ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী পাওয়ার জটিলতা নিয়ে আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ববর্তী বিভিন্ন রায় পর্যালোচনা করেন। বিজ্ঞ বিচারক রায়ে উল্লেখ করেন, ধর্ষণ জাতীয় যৌন অপরাধের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী পাওয়া যায় না। এ কারণে সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন মামলায় সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, ধর্ষণের ক্ষেত্রে কেবল একজন সাক্ষীর সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করেও শাস্তি দেওয়া যাবে। উক্ত বিষয়ে আদালত আপীল বিভাগের অন্যান্য সিদ্ধান্ত রায়ের গর্ভে পর্যালোচনা করেন। এছাড়া বিজ্ঞ আদালত কৃত অপরাধের গভীরতা বিশ্লেষণে শাস্তির অনুপাত সম্পর্কেও উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করেন।

বিচারক রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, যখন কোনো শিশু যৌন নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের শিকার হয়, তখন তা শুধু একটি পরিবারকে নয়, সমগ্র সমাজকে গভীরভাবে আহত করে এবং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

বিচারক বলেছেন, শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের এই মামলাটি কেবল একটি ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম নয়। এটি আমাদের সমাজের বিবেক, মানবতা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের প্রতি এক গভীর ও কঠিন পরীক্ষা। একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে নিভিয়ে দেওয়ার অভিযোগে দায়েরকৃত এ মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা বেদনা, ক্ষোভ, উদ্বেগ এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ।  যখন কোনো শিশু যৌন নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের শিকার হয়, তখন তা শুধু একটি পরিবারকে নয়, সমগ্র সমাজকে গভীরভাবে আহত করে এবং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

বিচারক আরও বলেন, নারী এ শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে গঠিত এই ট্রাইব্যুনাল বর্তমানে এক হাজার আট শতাধিক বিচারাধীন মামলার দায়িত্ব পালন করছে, যার প্রতিটি মামলাই শিশুদের প্রতি সংঘটিত সহিংসতা, যৌন নির্যাতন, শারীরিক নির্যাতন অথবা অন্যান্য গুরুতর অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রতিটি মামলার পেছনে রয়েছে একটি শিশুর অসহনীয় যন্ত্রণা, একটি পরিবারের দীর্ঘশ্বাস এবং ন্যায়বিচারের জন্য প্রতীক্ষারত অসংখ্য মানুষের প্রত্যাশা।

সেই প্রেক্ষাপটে শিশু রামিসার মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ এ মামলায় তদন্ত, বিচারিক কার্যক্রম এবং সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল সন্তোষের সঙ্গে লক্ষ্য করেছে যে, তদন্তকারী সংস্থা অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছে।

একইভাবে, বিজ্ঞ প্রসিকিউশন মামলার সকল গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে অতি অল্প সময়ের মধ্যে আদালতের সম্মুখে উপস্থাপন করে বিচারকার্য দ্রুত ও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তা, প্রসিকিউশন এবং বিচারকার্যে সংশ্লিষ্ট সকলের এই আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্ব প্রশংসার দাবিদার।

রায়ের নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়, গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে যখন এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটছিল, তখন আসামি স্বপ্না আক্তার ঘরের ভেতরেই ছিলেন। তার স্বামী সোহেল রানা যখন রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ ও পরে গলা কেটে হত্যা করছিল, তখন স্বপ্না তা প্রতিরোধ করেননি, বরং অপরাধ সংগঠনে সহায়তা করেছেন।

রামিসাকে খোঁজাখুঁজি করার সময় বাইরে থেকে তার বাবা-মা ও প্রতিবেশীরা যখন দরজায় অবিরাম ধাক্কা দিচ্ছিলেন ও চিৎকার করছিলেন, তখনো স্বপ্না ইচ্ছা করেই দরজা খোলেননি। বরং তিনি তার স্বামী সোহেল রানাকে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যেতে সরাসরি সহায়তা করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি এই ঘৃণ্য অপরাধে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন।

মামলার ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য, সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং আসামির স্বেচ্ছায় দেওয়া দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে আদালত নিশ্চিত হয়েছেন যে, শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও পরবর্তী নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সোহেল রানা এবং তাকে সহায়তার অপরাধে তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন সম্পূর্ণভাবে জড়িত ছিলেন।

সার্বিক বিবেচনা শেষে আদালত প্রধান আসামি সোহেল রানাকে ফাঁসির আদেশ দেন এবং ৫ লাখ টাকা জরিমানা করেন।

একই সঙ্গে অপরাধের সহযোগী ও আলামত ধ্বংস করার দায়ে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয় এবং ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

হাইকোর্টের অনুমোদন সাপেক্ষে গলায় ফাঁসি দিয়ে এই দম্পতির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এছাড়া আদায়কৃত জরিমানার টাকা নিহত রামিসার পরিবারের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/11182 ,   Print Date & Time: Sunday, 4 October 2026, 09:27:44 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh