![]()
প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে আম, পেয়ারা, কাঁঠালসহ দেশীয় ফলের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বাংলাদেশের ফল রপ্তানি ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে ফল রপ্তানি করে দেশ ১২ কোটি ৩০ লাখ ২০ হাজার ডলার আয় করেছে। তুলনামূলকভাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পুরো বছরে এ খাত থেকে আয় হয়েছিল ৬ কোটি ৭৫ লাখ ১০ হাজার ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে ফল রপ্তানি আয় ৮২ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
পরিসংখ্যান বলছে, গত তিন অর্থবছর ধরে ফল রপ্তানিতে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে এ খাত থেকে আয় ছিল মাত্র ১০ লাখ ৬০ হাজার ডলার, সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ কোটি ৯২ লাখ ৪০ হাজার ডলারে। এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ৬ কোটি ৭৫ লাখ ১০ হাজার ডলারে পৌঁছায় এবং চলতি অর্থবছরে নতুন রেকর্ড গড়ে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের ফল বর্তমানে প্রধানত মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশিদের বাজারকে কেন্দ্র করে রপ্তানি হচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবদুল ওয়াহেদ বলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ ফল রপ্তানি এখনও প্রবাসী বাংলাদেশিদের চাহিদা পূরণে সীমাবদ্ধ। আন্তর্জাতিক মূলধারার ফলের বাজারে প্রবেশ করতে হলে বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী পণ্যের গুণগত মান, প্যাকেজিং এবং ব্র্যান্ডিং আরও উন্নত করতে হবে।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ‘বাদাম, তাজা বা শুকনো’ শ্রেণির পণ্য থেকে সবচেয়ে বেশি আয় এসেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ১২ কোটি ২৮ লাখ ১৮ হাজার ডলার, যেখানে আগের অর্থবছরে আয় ছিল ৬ কোটি ৬০ লাখ ৫০ হাজার ডলার। পাশাপাশি হিমায়িত ফল ও বাদাম রপ্তানি থেকেও আয় বেড়েছে। তাজা ফল রপ্তানিও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
রপ্তানিকারকদের মতে, গ্রীষ্মকালীন ফলের মধ্যে আম এখনও বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, কুয়েত, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশি আমের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য ও উন্নত মানের কারণে পেয়ারা, কাঁঠাল, আনারস, লিচু ও কলার মতো ফলের চাহিদাও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের ফল মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। ইপিবির পরিচালক কুমকুম সুলতানা বলেন, দেশের পার্বত্য অঞ্চলে ড্রাগন ফল, কাজুবাদাম ও কফির মতো উচ্চমূল্যের ফসলের চাষ দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে রপ্তানি খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। তিনি মনে করেন, প্যাকিং শেড, ফসলোত্তর প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত সহায়তা বাড়ানো গেলে ফল রপ্তানির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে।
ইপিবির সহসভাপতি মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, ফল রপ্তানি দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে, কারণ এ খাতটি মূলত দেশীয় কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল এবং এতে আমদানিনির্ভর উপকরণের প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কম। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি স্থানীয় কৃষক ও উদ্যোক্তারাও সরাসরি উপকৃত হন।
তবে ইতিবাচক অগ্রগতির মধ্যেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। রপ্তানিকারকদের মতে, উচ্চ বিমান ভাড়া, সীমিত কার্গো সুবিধা, পর্যাপ্ত কোল্ড-চেইন ও শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থার অভাব এবং শুল্ক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এখনও বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। এছাড়া কোয়ারেন্টিন সনদ ও আধুনিক প্যাকেজিং সুবিধাসহ বেশিরভাগ রপ্তানিসংশ্লিষ্ট সেবা ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় দূরবর্তী অঞ্চলের রপ্তানিকারকদের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়।
খাতসংশ্লিষ্টদের আশা, আম রপ্তানির মৌসুম এখনো চলমান থাকায় অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে ফল রপ্তানি থেকে আয় আরও বাড়বে। তারা মনে করেন, পরিবহন ব্যয় কমানো, রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজ করা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা গেলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ফলের বাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।