![]()
জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং দামের ঊর্ধ্বগতির চাপ মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে আসন্ন জাতীয় বাজেটে একগুচ্ছ প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। একই সঙ্গে দেশীয় শিল্প, বিশেষ করে গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার, ল্যাপটপ এবং বৈদ্যুতিক যান (ইভি) উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন সুবিধা ঘোষণা বা বিদ্যমান সুবিধার মেয়াদ আরও কয়েক বছর বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাক-বাজেট আলোচনায় উঠে এসেছে, বর্তমানে স্থানীয়ভাবে কম্পিউটার ও ল্যাপটপ উৎপাদনে যে ভ্যাট অব্যাহতি রয়েছে, তার মেয়াদ ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। তবে সরকার এই সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর চিন্তা করছে। একইভাবে ব্লেন্ডার ও জুসারের মতো হোম অ্যাপ্লায়েন্স তৈরিতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান হ্রাসকৃত শুল্ক সুবিধাও ২০৩০ সাল পর্যন্ত বর্ধিত হতে পারে।
এদিকে বৈদ্যুতিক যানবাহন আমদানিতে বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ করের বোঝা রয়েছে, যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর প্রস্তাব বিবেচনায় আছে। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে ইভি উৎপাদন উৎসাহিত করতে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড়, ভ্যাট অব্যাহতি এবং আয়কর সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও বড় ধরনের কর সুবিধা আসতে পারে। বর্তমানে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানিতে ৩৬ থেকে ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে এই হার কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য কর ছাড়ের মেয়াদ ২০৩০ সাল থেকে বাড়িয়ে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত করা হতে পারে।
এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরকার ঘোষিত অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর একটি। তাই এই খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে আমদানি শুল্ক, ভ্যাট ও আয়করে সর্বোচ্চ সুবিধা দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রথম পাঁচ বছর সম্পূর্ণ করমুক্ত সুবিধা পাবে। পরবর্তী তিন বছর ৫০ শতাংশ এবং আরও দুই বছর ২৫ শতাংশ কর ছাড় দেওয়া হবে।
সৌরবিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তারা সরকারের এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। এনজেড টেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালেউধ জামান খান বলেন, বর্তমানে কিছু সৌর যন্ত্রাংশের ওপর ৯০ শতাংশের বেশি আমদানি কর রয়েছে। কর কমানো হলে উদ্যোক্তারা আরও বেশি বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। তার মতে, বর্তমানে এক মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে ৩ থেকে ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা খরচ হয়, তবে কর ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হলে প্রতি মেগাওয়াটে প্রায় ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় কমতে পারে।
বর্তমানে শিল্প খাতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ৫০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন বিনিয়োগের ফলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ এই সক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। তবে স্থানীয় শিল্প সুরক্ষার বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছেন উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশ সোলার মডিউল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক গোলাম বাকী মাসুদ বলেন, স্থানীয় উৎপাদনকারীদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা না থাকলে বিদ্যমান শিল্প টিকে থাকা কঠিন হবে। ইতোমধ্যে অসম প্রতিযোগিতার কারণে সৌর যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী ১১ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯টিই বাজার থেকে হারিয়ে গেছে।
স্থানীয় গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি শিল্পের বিকাশেও সরকারের নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, দেশীয় শিল্পের জন্য সরকারের সহায়তা বজায় থাকলে আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। কর বিশেষজ্ঞরাও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তাদের মতে, এসব সুবিধা থেকে দেশীয় শিল্প কতটা লাভবান হচ্ছে, আমদানিনির্ভরতা কতটা কমছে এবং ভোক্তারা কতটা সুবিধা পাচ্ছেন—সেগুলো নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও আমদানি-বিকল্প শিল্পে প্রণোদনা অব্যাহত থাকলে তা একদিকে যেমন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াবে, অন্যদিকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও শিল্পায়নেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।