![]()
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার জন্য দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চলমান আলোচনা দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়। গত ৪ জুন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়েছে, হয় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হবে, নয়তো পুরো উদ্যোগ বাতিল করতে হবে। মন্ত্রণালয়ের এ নির্দেশনার ফলে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এনসিটি পরিচালনা নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ এখন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ওপর পড়েছে।
মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ভিত্তিতে এনসিটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইনডিপেনডেন্ট টার্মিনাল অপারেটর (আইটিও) নিয়োগের লক্ষ্যে ডিপি ওয়ার্ল্ড এফজেডইর সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে আলোচনায় অগ্রগতি না হলে প্রকল্পটি বাতিলের বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এর আগে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করলে মন্ত্রণালয় দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের তাগিদ দেয়।
পিপিপি কর্তৃপক্ষও পৃথক এক চিঠিতে জানিয়েছে, এনসিটি প্রকল্পটি গভর্নমেন্ট-টু-গভর্নমেন্ট (জিটুজি) অংশীদারিত্ব নীতিমালার আওতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। ফলে উন্মুক্ত দরপত্রের জন্য প্রযোজ্য মূল্যায়ন কমিটির বিধান এখানে প্রযোজ্য নয়। জিটুজি নীতিমালা অনুযায়ী, বিনিয়োগকারী নির্বাচন ও চুক্তির শর্ত নির্ধারণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বা সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে সম্পন্ন হবে। একই সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ড ও পিপিপি কর্তৃপক্ষের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে উভয় পক্ষকে প্রয়োজনবোধে যেকোনো সময় আলোচনা থেকে সরে আসার সুযোগও রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক বলেছেন, এনসিটি দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালগুলোর একটি। বর্তমানে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড এটি পরিচালনা করছে। ভবিষ্যতে কে পরিচালনা করবে, সে সিদ্ধান্ত দেশের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই নেওয়া হবে।
২০০৭ সালে আংশিক এবং ২০১৫ সালে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়ার পর থেকে এনসিটি চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনাল হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি মে মাসে টার্মিনালটিতে এক লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা এর ইতিহাসে এক মাসে সর্বোচ্চ। এর আগে সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল ২০২৫ সালের অক্টোবরে, যখন এক লাখ ২৫ হাজার ৫৩৩ টিইইউ কনটেইনার পরিচালনা করা হয়েছিল।
এনসিটি বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার উদ্যোগ প্রথম নেয় আওয়ামী লীগ সরকার। ২০২৩ সালে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি পিপিপি ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের অনুমোদন দেয় এবং আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থা আইএফসিকে ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজার হিসেবে নিয়োগ করা হয়। পরে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছরের জন্য টার্মিনাল পরিচালনার বিষয়ে আলোচনা শুরু হলেও তা চূড়ান্ত হয়নি।
সম্প্রতি দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটি পরিচালনার বিষয়ে নতুন করে আগ্রহ প্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠানটি রাজস্ব, ব্যয় ও জনবল কাঠামো সম্পর্কে আরও স্বচ্ছ তথ্য চাওয়ার পাশাপাশি প্রস্তাবিত ১৫ বছরের কনসেশন মেয়াদ এবং টার্মিনাল আধুনিকায়নে বিনিয়োগের বিষয়েও আলোচনা করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের লজিস্টিকস অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাবও দিয়েছে তারা।
তবে এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। সমালোচকদের মতে, রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে নির্মিত এবং দীর্ঘদিন ধরে লাভজনকভাবে পরিচালিত একটি টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরের কাছে হস্তান্তরের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে বন্দর ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত হলে দক্ষতা, প্রযুক্তি ও সেবার মান আরও বাড়তে পারে বলেও মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে এখন আলোচনার ভবিষ্যৎ এবং এনসিটির পরিচালনার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল।