• হোম > দেশজুড়ে | বাংলাদেশ > মাসে চাহিদা ৫৮ ট্রেনের, পাঁচ মাসে চলেছে ৪৫টি

মাসে চাহিদা ৫৮ ট্রেনের, পাঁচ মাসে চলেছে ৪৫টি

  • বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬, ১০:৫২
  • ৭৩

মাসে চাহিদা ৫৮ ট্রেনের, পাঁচ মাসে চলেছে ৪৫টি

দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রেলপথনির্ভর হলেও লোকোমোটিভ সংকটের কারণে এ খাতে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানিকৃত জ্বালানি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছাতে প্রতিদিন অন্তত দুটি ট্রেনের প্রয়োজন হলেও চাহিদার তুলনায় ট্রেন পরিচালনা হচ্ছে অনেক কম। প্রতি মাসে যেখানে গড়ে ৫৮টি জ্বালানিবাহী ট্রেন প্রয়োজন, সেখানে গত পাঁচ মাসে চালানো হয়েছে মাত্র ৪৫টি ট্রেন। ফলে সিলেট, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে লোকোমোটিভের ঘাটতি রয়েছে। এ সংকটের কারণে প্রতি মাসে ৭০০ থেকে ৮০০ ট্রেনের যাত্রা বাতিল হচ্ছে এবং ট্রেন পরিচালনায় নিয়মিত বিলম্ব ঘটছে। পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সূচির বাধ্যবাধকতা না থাকলেও লোকোমোটিভ বরাদ্দে রেলওয়ের অনীহা স্পষ্ট বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন, জ্বালানি বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বারবার রেলপথে পণ্য পরিবহন বাড়ানোর আহ্বান জানালেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। এর ফলে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, একই সঙ্গে লাভজনক পণ্য পরিবহন খাতে পিছিয়ে থাকায় রেলওয়ের রাজস্ব আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, লোকোমোটিভের অভাবে চট্টগ্রামে একাধিক জ্বালানিবাহী ও কনটেইনারবাহী ট্রেন আটকে রয়েছে। ২৫ মে থেকে সিলেটগামী, ২৩ মে থেকে শ্রীমঙ্গলগামী এবং ২৭ মে থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টগামী জ্বালানিবাহী ট্রেন লোডিং সম্পন্ন হওয়ার পরও যাত্রা শুরু করতে পারেনি। একইভাবে ২৬ মে থেকে নয়টি ট্রেনের সমপরিমাণ কনটেইনারবোঝাই রেক চট্টগ্রামের সিজিপিওয়াই ইয়ার্ডে আটকে আছে। এসব রেকে মোট ৩৭৭ টিইইউস কনটেইনার রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতরেও পড়ে আছে আরও ১৬৫ টিইইউস কনটেইনার।

ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে আমদানি করা পণ্যও পরিবহন সংকটে পড়েছে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার কমলাপুর আইসিডিতে প্রতিদিন প্রায় ২০০ টিইইউস কনটেইনার পরিবহনের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে রেলপথে সর্বোচ্চ ৭০ থেকে ৭৫ টিইইউস পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে। খাদ্য বিভাগের নিয়মিত চাহিদা থাকা সত্ত্বেও কয়েক মাস ধরে সরকারি খাদ্যশস্য পরিবহন কার্যক্রমও কার্যত বন্ধ রয়েছে।

রেলপথে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় দেশের প্রধান সরবরাহ রুটগুলোও চাপের মুখে পড়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত তিন জ্বালানি বিপণন প্রতিষ্ঠান—Padma Oil Company Limited, Meghna Petroleum Limited এবং Jamuna Oil Company Limited—এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে সিলেট ডিপোতে ৩০টি, শ্রীমঙ্গলে ১২টি, রংপুরে ১০টি এবং ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট ডিপোতে ৬টি জ্বালানিবাহী ট্রেন পরিচালনার প্রয়োজন হয়। কিন্তু মে মাসের প্রথম সপ্তাহে সিলেট, রংপুর ও ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে একটি ট্রেনও চালানো সম্ভব হয়নি; কেবল শ্রীমঙ্গলে একটি ট্রেন পরিচালিত হয়েছে।

জ্বালানি বিপণন কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা জানান, রেল পরিবহন সংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে ডিলার ও এজেন্টদের নির্ধারিত ডিপোর পরিবর্তে বিকল্প ডিপো থেকে জ্বালানি সংগ্রহের অনুমতি দিতে হচ্ছে। ফলে কোথাও অতিরিক্ত চাপ, কোথাও সরবরাহ ঘাটতি এবং সামগ্রিকভাবে পরিবহন ব্যয় ও সময়—দুটিই বেড়ে যাচ্ছে। বর্তমানে সিলেট অঞ্চলের চাহিদা ভৈরব ডিপো এবং রংপুর অঞ্চলের চাহিদা বাঘাবাড়ি ও পার্বতীপুর ডিপোর মাধ্যমে মেটাতে হচ্ছে।

পদ্মা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান বলেন, রেলপথে জ্বালানি পরিবহন সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা। ব্রিটিশ আমল থেকে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ওয়াগনের মাধ্যমে সরাসরি বিভিন্ন ডিপোতে জ্বালানি সরবরাহ করা হয়ে আসছে। কিন্তু বর্তমান সংকটের কারণে বিকল্প ও ব্যয়বহুল পদ্ধতিতে জ্বালানি পরিবহন করতে হচ্ছে। তিনি জানান, চাহিদা অনুযায়ী ট্রেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে রেলওয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

রেলওয়ের কর্মকর্তাদের মতে, পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনায় অত্যাধুনিক লোকোমোটিভের প্রয়োজন হয় না এবং কম গতির ইঞ্জিন দিয়েও এসব ট্রেন চালানো সম্ভব। তবুও যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগ নিয়মিত চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত লোকোমোটিভ সরবরাহ করতে পারছে না।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক Mohammad Afzal Hossain বলেন, প্রায় এক দশক ধরে রেলওয়ে লোকোমোটিভ সংকটে ভুগছে। দীর্ঘদিন নতুন ইঞ্জিন আমদানি না হওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে নতুন লোকোমোটিভ সংগ্রহ এবং বিদ্যমান ইঞ্জিন ওভারহোলিংয়ের মাধ্যমে সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে। তিনি ভবিষ্যতে জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবহনে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/11023 ,   Print Date & Time: Monday, 28 September 2026, 02:37:23 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh