• হোম > টেকনোলজি > বঙ্গোপসাগরে জেলেদের জালে ধরা পড়া ‘স্বয়ংক্রিয় সামুদ্রিক যান’ নিয়ে কৌতূহল

বঙ্গোপসাগরে জেলেদের জালে ধরা পড়া ‘স্বয়ংক্রিয় সামুদ্রিক যান’ নিয়ে কৌতূহল

  • মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬, ১৪:২৯
  • ৭৪

বঙ্গোপসাগরে জেলেদের জালে ধরা পড়া ‘স্বয়ংক্রিয় সামুদ্রিক যান’ নিয়ে কৌতূহল

বরগুনার পাথরঘাটা উপকূলে মাছ ধরার সময় জেলেদের জালে ধরা পড়েছে একটি রহস্যময় যান্ত্রিক বস্তু, যা দেখতে অনেকটা পানির নিচে চলাচলকারী স্বয়ংক্রিয় গবেষণা যানের মতো। প্রায় আট ফুট দীর্ঘ লাল-হলুদ রঙের এ যন্ত্রকে ঘিরে স্থানীয় জেলে, প্রশাসন এবং গবেষক মহলে ব্যাপক কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে।

সমুদ্রবিজ্ঞানীদের প্রাথমিক ধারণা, এটি একটি ‘অটোনোমাস আন্ডারওয়াটার ভেহিকেল’ (এইউভি) বা স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের গবেষণা যান হতে পারে। সাধারণত সমুদ্র গবেষণা, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, সমুদ্রতলের মানচিত্রায়ণ, জলবায়ু তথ্য সংগ্রহ এবং সামরিক নজরদারির মতো কাজে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। তবে বাংলাদেশের উপকূলীয় জলসীমায় এমন একটি যানের উপস্থিতি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রোববার বিকেলে পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের খলিফার হাট এলাকার একটি মাছ ধরার ট্রলার বঙ্গোপসাগরের মোহনা এলাকায় মাছ শিকারে যায়। জাল তোলার সময় জেলেরা অস্বাভাবিক ভার অনুভব করেন।

ট্রলারের জেলে মিরাজ হোসেন জানান, প্রথমে তারা ধারণা করেছিলেন কোনো বড় আকারের মাছ জালে আটকা পড়েছে। তবে জাল তোলার পর দেখতে পান, সেটি আসলে একটি অজানা যন্ত্র।

“আমরা আগে কখনো এমন কিছু দেখিনি। যন্ত্রটির গায়ে পাখার মতো অংশ এবং ভেতরে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস দেখতে পেয়ে কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম,” বলেন তিনি।

প্রথমদিকে অনেকেই এটিকে ক্ষেপণাস্ত্রের অংশ বা সামরিক কোনো সরঞ্জাম বলে সন্দেহ করেছিলেন। পরে জেলেরা যন্ত্রটি ট্রলারে তুলে সোমবার সকালে পাথরঘাটায় নিয়ে আসেন এবং বিষয়টি প্রশাসনকে অবহিত করেন। খবর পেয়ে পাথরঘাটা থানা পুলিশ সেটি নিজেদের হেফাজতে নেয়।

কী রয়েছে যন্ত্রটির ভেতরে?

উদ্ধার হওয়া যন্ত্রটির ছবিতে দেখা যায়, এটি টর্পেডোর মতো দীর্ঘ সিলিন্ডার আকৃতির। উভয় প্রান্ত গোলাকার এবং পেছনে স্থিতিশীলতার জন্য পাখা বা ফিন রয়েছে। ওপরের আবরণ খুললে ভেতরে ব্যাটারি ইউনিট, সেন্সর, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মডিউল এবং অ্যানটেনাসদৃশ যোগাযোগ ডিভাইস দেখা যায়।

যন্ত্রটির পরিচয় জানতে ছবিগুলো পাঠানো হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও সামুদ্রিক প্রাণিবিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ আবদুল আজিজের কাছে। ছবি পর্যালোচনা করে তিনি বলেন, এটি একটি অটোনোমাস আন্ডারওয়াটার ভেহিকেল (এইউভি) হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

তার মতে, “বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় নিয়মিত এ ধরনের যান ব্যবহারের তথ্য আমার জানা নেই। ছবিতে যা দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে এটি সচল অবস্থায় ছিল না। সম্ভবত যান্ত্রিক ত্রুটি বা শক্তি হারানোর কারণে স্রোতের টানে উপকূলের দিকে ভেসে এসেছে।”

তিনি আরও জানান, এই ধরনের যান দীর্ঘ সময় পানির নিচে অবস্থান করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে এবং পরে নির্ধারিত স্থানে ফিরে যায় অথবা সংগৃহীত তথ্য প্রেরণ করে।

কোথা থেকে এলো এই যান?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, আবহাওয়া সংস্থা, নৌবাহিনী এবং অফশোর তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো নিয়মিত এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকে। যদি যন্ত্রটি বিদেশি কোনো সংস্থার হয়ে পরিচালিত হয়ে থাকে, তাহলে অচল হয়ে যাওয়ার পর স্রোতের টানে এটি বাংলাদেশের জলসীমায় চলে আসতে পারে।

গবেষকদের ধারণা, যন্ত্রটির প্রকৃত পরিচয় জানতে এর গায়ে থাকা সিরিয়াল নম্বর, প্রস্তুতকারকের তথ্য, মেমোরি ডেটা, সেন্সর কনফিগারেশন এবং যোগাযোগ প্রযুক্তি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। ভেতরে সংরক্ষিত তথ্য উদ্ধার করা গেলে এটি কোথা থেকে এসেছে, কতদিন সমুদ্রে ছিল এবং কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করছিল—সে বিষয়েও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

প্রশাসনের পদক্ষেপ

পাথরঘাটা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ সোহান জানান, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে যন্ত্রটি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এটি কী ধরনের প্রযুক্তি এবং কোথা থেকে এসেছে, তা জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাপস পাল বলেন, “বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতামত পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/10923 ,   Print Date & Time: Monday, 5 October 2026, 03:48:35 PM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh