• হোম > বিদেশ | মধ্যপ্রাচ্য > যুদ্ধের শুরু থেকেই ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে কয়েক ডজন হামলা চালিয়েছে আরব আমিরাত: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

যুদ্ধের শুরু থেকেই ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে কয়েক ডজন হামলা চালিয়েছে আরব আমিরাত: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

  • শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ১২:৪২
  • ৮১

যুদ্ধের শুরু থেকেই ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে কয়েক ডজন হামলা চালিয়েছে আরব আমিরাত: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। শুক্রবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ চলাকালে, এমনকি যুদ্ধবিরতির সময়ও ইরানের ওপর কয়েক ডজন বিমান হামলা চালিয়েছে আবুধাবি। এর ফলে স্পষ্ট হয়েছে যে, এই যুদ্ধে আমিরাত আগে যতটা স্বীকার করেছিল, বাস্তবে তার চেয়েও অনেক আগে এবং অনেক গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছিল।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলোর বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধের একেবারে শুরু থেকেই ইরানের ওপর হামলা চালাতে শুরু করেছিল আরব আমিরাত। এমনকি গত এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও তাদের আক্রমণ বন্ধ হয়নি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সামরিক অভিযানে আমেরিকা ও ইসরায়েলের পাশাপাশি তৃতীয় পক্ষ হিসেবে কার্যত সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে নেমেছিল আবুধাবি।

ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করেই এসব হামলা চালানো হয়। ইসরায়েল এতে মূলত গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে।

হরমুজ প্রণালির কেশম ও আবু মুসা দ্বীপ, বন্দর আব্বাস, লাভান দ্বীপের তেল শোধনাগার এবং আসালুয়েহ পেট্রোরসায়ন কমপ্লেক্স ছিল আমিরাতের প্রধান লক্ষ্যবস্তু।

আরব আমিরাতের কয়েকটি হামলায় ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে আসালুয়েহ কমপ্লেক্সে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে চালানো একটি হামলার পর আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ওয়াশিংটন তখন ইসরায়েলকে ইরানের তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করার অনুরোধ জানাতে বাধ্য হয়।

অথচ যুদ্ধ শুরুর আগে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো প্রকাশ্যে দাবি করেছিল, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে তারা নিজেদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না। কিন্তু প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেই অবস্থান থেকে পুরোপুরি সরে আসে আবুধাবি।

পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন শহর, বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ে ইরান। মূলত আমেরিকা ও তাদের মিত্রদের এই অভিযানের খরচ ও ক্ষয়ক্ষতি বাড়িয়ে দেওয়াই ছিল তেহরানের লক্ষ্য।

আর ইরানের এই পাল্টা আক্রমণের সবচেয়ে বড় ধাক্কা সহ্য করতে হয়েছে আমিরাতকে। তাদের লক্ষ্য করে অন্তত ২ হাজার ৮০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

আমিরাতের এই সম্পৃক্ততা উপসাগরীয় দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এপ্রিলের শুরুতে সৌদি আরব গোপনে আমেরিকার কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছিল, আমিরাতের এই আগ্রাসনের কারণে গোটা অঞ্চলের তেল ও জ্বালানি খাতে ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে বিশ্ব তেলবাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র যাতে আবুধাবিকে সামরিক অভিযান বন্ধ করে কূটনৈতিক পথে হাঁটতে বলে, সে জন্য সৌদি কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন।

এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কোনো সাড়া দেয়নি। হোয়াইট হাউসও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

এই সংঘাত উপসাগরীয় অঞ্চলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যকার বিরোধও সামনে নিয়ে এসেছে। রিয়াদ ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযানে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ওপর ক্ষুব্ধ হন আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ।

এরই মধ্যে লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইয়েমেন ও সুদানে ছায়াযুদ্ধে জড়িয়ে রয়েছে দুই উপসাগরীয় শক্তি। তার ওপর এ ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্কে আরও টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। এরপর এপ্রিলে সৌদি নেতৃত্বাধীন তেল উৎপাদনকারী জোট থেকে বেরিয়ে যায় আরব আমিরাত এবং আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার করতে শুরু করে।

বিমান হামলার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ ভাঙতে সামরিক শক্তি প্রয়োগের জন্য জাতিসংঘে উত্থাপিত একটি প্রস্তাবের খসড়াতেও সরাসরি সমর্থন দেয় আমিরাত।

এ ছাড়া দুবাইয়ে ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিদ্যালয় ও ক্লাব বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাতিল করা হয় ইরানি নাগরিকদের ভিসা ও যাত্রাবিরতি সুবিধা।

প্রতিক্রিয়ায় তেহরান বারবার অভিযোগ করেছে, আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে হামলায় সরাসরি অংশ নিয়েছে আমিরাত।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে আরব আমিরাতের। নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় শক্তি প্রদর্শনেও পিছপা হয় না তারা। আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোকাবিলায় গত কয়েক বছরে সুদান ও লিবিয়ার বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে আধুনিক অস্ত্র দিয়েছে আবুধাবি এবং ইয়েমেনেও একাধিক অভিযান পরিচালনা করেছে।

তবে ইরানের মতো বড় ও নিকটবর্তী প্রতিপক্ষকে দীর্ঘমেয়াদে মোকাবিলা করার সক্ষমতা তাদের রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ইরানের জোরালো পাল্টা আক্রমণের কারণে আমিরাতের অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা লাগে। বিমান চলাচল ব্যাহত হয়, পর্যটন খাতের আয় কমে যায় এবং আবাসন বাজারে মন্দা দেখা দেয়। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংকট তৈরি হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই ও বাধ্যতামূলক অবৈতনিক ছুটির ঘোষণা দিতে শুরু করে।

এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত দুবাই ও আবুধাবির শেয়ারবাজার থেকে প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ বিনিয়োগ হারিয়ে যায়। পাশাপাশি বাতিল করতে হয় ১৮ হাজার ৪০০-এর বেশি উড়োজাহাজ চলাচল।

পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠায় সম্প্রতি কিছুটা নমনীয় অবস্থান নিয়েছে আরব আমিরাত। জ্বালানি স্থাপনাগুলো ঝুঁকির মুখে পড়ায় তারা এখন কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছে। মে মাসের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ফোন করে ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির পক্ষে চাপ সৃষ্টি করা আঞ্চলিক নেতাদের মধ্যে আমিরাতের প্রেসিডেন্টও ছিলেন।

তবে ইসরায়েলের সঙ্গে আমিরাতের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে আমিরাতের ভূমিকা দেখে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা উৎসাহিত হয়েছেন। তারা এই সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত জোট হিসেবে দেখছেন।

যুদ্ধ চলাকালে আমিরাতকে সহায়তা করতে ইসরায়েল ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সামরিক সদস্য পাঠিয়েছিল। উপসাগরীয় দেশটির একটি সামরিক ঘাঁটিতে এখনো ইসরায়েলি সেনাসদস্য মোতায়েন রয়েছে। এ ছাড়া গোপনে আমিরাত সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, মোসাদ প্রধান এবং ইসরায়েলের সেনাপ্রধানসহ দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা।


This page has been printed from Entrepreneur Bangladesh - https://www.entrepreneurbd.com/10775 ,   Print Date & Time: Tuesday, 6 October 2026, 02:53:52 AM
Developed by: Dotsilicon [www.dotsilicon.com]
© 2026 Entrepreneur Bangladesh