![]()
Asian Development Bank-এর এক বিস্তারিত মূল্যায়নে বাংলাদেশের সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ ও প্রশাসনিক সক্ষমতায় অগ্রগতির পাশাপাশি নানা কাঠামোগত দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিজিটালাইজেশন ও প্রশাসনিক সংস্কারে বাংলাদেশ কিছু দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করলেও দুর্বল তদারকি, বাস্তবায়ন ঘাটতি, দুর্নীতি এবং প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রত্যাশিত সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় অন্যতম বড় সমস্যা হচ্ছে বকেয়া ব্যয়ের তথ্য পর্যবেক্ষণের জন্য কার্যকর কোনো কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা না থাকা। বর্তমানে ‘আইবাস প্লাস প্লাস’ সিস্টেমে কেবল অর্থ পরিশোধের তথ্য সংরক্ষণ করা হয়, কিন্তু কত বিল বা দায় বকেয়া রয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। ফলে সরকারের প্রকৃত আর্থিক দায় নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের অগ্রগতির বিষয়টিও প্রতিবেদনে ইতিবাচকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে ‘আইবাস প্লাস প্লাস’, ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার এবং ই-চালান চালুর ফলে হিসাব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও গতি বেড়েছে। আন্তর্জাতিক হিসাবমানের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতেও সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।
তবে এখনো পুরনো ট্রেজারি বিধি, দক্ষ জনবলের অভাব এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিকাংশ মন্ত্রণালয়ে কার্যকর অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। আইন থাকলেও বেশিরভাগ মন্ত্রণালয়ে ইন্টারনাল অডিট ইউনিট নেই। বর্তমানে কেবল পাঁচটি উচ্চ ব্যয়সম্পন্ন বিভাগে সীমিত পরিসরে এ ইউনিট চালু রয়েছে এবং সেখানেও জনবল ও দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রতিবেদনে সমালোচনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, অনেক প্রকল্প পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ছাড়াই অনুমোদন পায়। এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা দীর্ঘদিনের।
২০১৩ থেকে ২০২২ অর্থবছরের মধ্যে পরিবহন খাতের ৩২৯টি প্রকল্প বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক প্রকল্পেই সময় ও ব্যয়—দুটিই বেড়েছে। গড়ে প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে ২৬ দশমিক ৩ শতাংশ এবং বাস্তবায়ন সময় বেড়েছে প্রায় ৯৫ শতাংশ।
সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, দেশে একীভূত সরকারি ক্রয় আইন ও ই-জিপি ব্যবস্থা চালু থাকলেও বাস্তবে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়া, দরপত্রে যোগসাজশ এবং অস্বচ্ছতা এখনো বড় সমস্যা। বিশেষ করে ±১০ শতাংশ মূল্যসীমা নীতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত প্রতিযোগিতা কমেছে এবং একক দরপত্রের সংখ্যা বেড়েছে।
তবে ই-জিপি চালুর ফলে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৯ অর্থবছরের মধ্যে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের সরকারি ক্রয়ের ৬২ শতাংশ ই-জিপির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। এতে ক্রয় প্রক্রিয়ার গড় সময় ৮৬ দশমিক ৭ দিন থেকে কমে ৬২ দশমিক ২ দিনে নেমে এসেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রায় ৭০ শতাংশ সরকারি চুক্তি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হয় না। অনেক প্রকল্প ছয় থেকে ১০ বছর পর্যন্ত বিলম্বিত হয়। এর পেছনে দুর্বল পরিকল্পনা, জমি অধিগ্রহণ জটিলতা, বাজেট পূর্বাভাসের দুর্বলতা এবং চুক্তি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করা হয়েছে।
সামগ্রিক মূল্যায়নে Asian Development Bank বলেছে, বাংলাদেশ সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার শুরু করলেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা, স্বচ্ছতা, দক্ষ জনবল এবং জবাবদিহির ঘাটতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। বিশেষ করে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি এবং দুর্বল তদারকি উন্নয়ন ব্যয়কে কম কার্যকর করে তুলছে।